জীবিত অবস্থায় দান করা সম্পত্তি ভোগের অধিকার রেখে বিল পাস

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:১৪ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৩ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ সন্তান বা নাতি-নাতনিকে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করেন। বিলের ওপর জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে প্রেরণ এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি শেষে বিলটি পাস হয়।

আরও পড়ুন: বন্যা-ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে নেপালে মাওলানা মামুনুল হক

বিলে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ কর্তৃক সন্তান বা নাতি-নাতনিকে অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভোগাধিকার বহাল থাকবে এবং আইন অনুযায়ী তা গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সম্বলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি সম্পর্কে বিধান থাকলেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। প্রস্তাবিত জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি।

আরও পড়ুন: নামজারির সময় জমির বাস্তব শ্রেণি যাচাইয়ের নির্দেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের

তিনি বলেন, এই বিধান সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো প্রকার সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও তৈরি হবে না।

বিলটির জনমত যাচাইয়ের ওপর আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আইনটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আনা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে যারা আল্লাহর বিধান মেনে চলেন, তারা কীভাবে আইনটি দেখবেন—সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘এই আইনের সঙ্গে শরিয়াতের স্পষ্টত কন্ট্রাডিকশন আছে। এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী কুরআনের মূলনীতি কী রাখব নাকি বাদ দেব? আমি মনে করি এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়।’

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতি ও প্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এভাবে আইনটি উপস্থাপন করা হলে সমাজে ব্যাপক উচ্ছৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আইনটির মাধ্যমে হকদারের অধিকারও বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, মানবিক দিক থেকে পিতা-মাতার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার অনুরোধ, এই অধিবেশনে আইনটি পাস না করে শরিয়া আইনের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হোক। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছেও বিলটি পাঠানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

পটুয়াখালী-২ আসনের শফিকুল ইসলাম বলেন, আইনটি নিয়ে ওলামা কেরামরা আপত্তি তুলেছেন। এ কারণে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর নাজিবুর রহমান আইনটিকে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী দাবি করে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল তারা কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে এই আইন পাস করা হচ্ছে। ইসলামিক স্কলারদেরও আইনটি নিয়ে ঘোর আপত্তি রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, পিতা-মাতা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক সময় সন্তানরা তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এটি বাস্তবতা ও দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু এই সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

পাবনা-৩ আসনের আলী আছগার বলেন, কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই বিলে হ্যাঁ বলা উচিত হবে।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মাসুদ পারভেজ বলেন, সব সন্তান পিতা-মাতার সঙ্গে এমন আচরণ করছেন না। গুটিকয়েক অপরাধীর কারণে মূল চিন্তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন পাস করা উচিত নয়।

বাগেরহাট-৪ আসনের আব্দুল আলীম বলেন, এই আইন না করে কুরআনে যে বিধান রয়েছে, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের বেশি কেউ দান করতে পারবে না—সেই বিধান আইনে পরিণত করা দরকার। ইসলামিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই আইন নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মতামত নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

শেরপুর-১ আসনের রাশেদুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে একটি নিয়ম থাকলেও তিনি বিশ্বাস করেন, অধিকাংশ সংসদ সদস্য এই আইন পাসের সময় হয় বিরোধিতা করবেন, নয়তো চুপ থাকবেন। ইসলামিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাঠামো তৈরি হলে তা মেনে নেওয়া যায় না।

ময়মনসিংহ-৬ আসনের কামরুল হাসান বলেন, আইনটি সংশোধন করতে গিয়ে মুসলিম পারিবারিক আইনে হাত দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকারের কথা বলে কৌশলে এই আইন পাস করা হচ্ছে। আইনটি সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য হবে—এমন বিধান যুক্ত করায় তাদের চরম আপত্তি রয়েছে। আইনটি পর্যালোচনা না করা হলে জনবিক্ষোভের আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল আইনটি দ্রুত পাসের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। যাতে কোনো ‘কুলাঙ্গার সন্তান’ কোনো বাবা-মাকে লাঞ্ছিত করতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পিতা-মাতার কথা বিবেচনা করে বিলটি আনার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

বিরোধী দলীয় সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, এই আইন হেবা বা অন্য কোনোভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এখানে মুসলিম ল’কে স্পর্শ করা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এই আইনে যে গিফট (সম্পত্তি হস্তান্তর) এর কথা বলা হচ্ছে তা হেবা নয়। এটি হেবার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই আইনে হেবা বা অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর বাধাগ্রস্ত হবে না।’

মুসলিম পারিবারিক আইনের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, সামাজিক বাস্তবতার কথা চিন্তা করেই বিলটি আনা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইসলামিক আইনে সুদ নয়, মুনাফা নেওয়া হয়। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামিক ব্যাংকগুলো মুনাফা নিলেও লোকসানের ভাগ নেয় না। লোকসানের ভাগদান না হলে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনুমোদিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একাধিক মুসলিম দেশের উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশ্বাস করে, এই আইন অগণিত পিতা-মাতার জীবনের শেষ নিশ্বাস শান্তিতে নিতে সহায়তা করবে। আইনটি সমাজের চাহিদা পূরণ করবে এবং মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১-এর তুলনায় ইসলামের সঙ্গে অসাংঘর্ষিক।

বিরোধী দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। জনগণ এই আইন সম্পর্কে জানতে পারবেন। তার দাবি, সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—অগণিত অবহেলিত ও নিরীহ শান্তিপ্রিয় বাবা-মায়ের শেষ নিশ্বাস যেন শান্তিতে হয়, সেটিই এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

পরে সংশোধনী প্রস্তাবের আলোচনায় নাজিবুর রহমান আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী ইসলামী ‘ল’ সম্পর্কে কতটা জানেন, তা তিনি জানেন না। তবে তার বক্তব্য ‘মিসলিডিং’ হয়েছে।

তিনি বলেন, সংসদে অনুমাননির্ভর অনেক কথা বলা হয়। ইসলামিক ব্যাংকিং নিয়ে আইনমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ‘সম্পূর্ণ অসত্য’ দাবি করে ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান তিনি।

নাজিবুর রহমান আরও বলেন, আইনমন্ত্রী কোন ইসলামিক স্কলারের সঙ্গে কথা বলে ইসলামিক ‘ল’ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, তা জানতে চান তিনি।

তার দাবি, জীবন শর্ত দিয়ে কোথাও হেবার কথা নেই। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের উদাহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই আইনটি ‘কালো আইন’ ছিল এবং তখন সবাই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।