সরকারের ছয় মাস না যেতেই এক দফার আন্দোলনে নানা রহস্য

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২:৫৫ পূর্বাহ্ন, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:১৯ পূর্বাহ্ন, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই দাবি আদায়ে সরকার পতনের এক দফার হুমকি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা রহস্য তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পর আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমতে চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতায় বিএনপি সরকার গঠন করে। সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। 

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জনগণের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা মোতাবেক না হলেও সকল কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষ সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবার আগে বাংলাদেশ কর্মসূচিতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার এমনকি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অতি সাধারণ জীবনযাপন আচরণ আরো বেশি প্রশংসিত হয়েছে। আগের সরকারের আন্তঃনীতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও জ্বালানির সংকটে সাময়িক দেশব্যাপী দুর্ভোগ নেমে আসলেও সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা সার্বক্ষণিক। 

আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরে ইটিডি পরিচালনা বিষয়ে স্থানীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

অপরদিকে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ঢিলেঢালা পুলিশি ব্যবস্থায় নাজুক পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সরকারও সন্তোষ প্রকাশ করে বাহিনীগুলো পুনর্গঠন ও নতুন সরকারের পদ্ধতিতে চলতে ধীরগতিতে জনমনে অস্বস্তি বিরাজ করলেও সরকারের অবহেলা দৃশ্যমান নেই। জ্বালানি সংকট ও আইন-শৃঙ্খলার অসন্তোষ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিরোধী দল হঠাৎ করেই দেশব্যাপী লাগাতর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকার পতনের এক দফার হুমকি দেওয়ায় রাজনৈতিক বলে সন্দেহ, সংশয় তৈরি হয়েছে। 

বিরোধী দলের এই কর্মসূচিতে 'গণভোটের রায়' বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সংকটের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করে এর বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। 

আরও পড়ুন: সংসদে আরও চার কমিটি গঠন, সভাপতি পদে নেই বিরোধী দলের কেউ

গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের সাথে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই লংমার্চের আয়োজন করেছিল বিরোধী এই জোট। ১১ দলীয় ঐক্য জোটের দাবিগুলো হলো-গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলী-য়করণ বন্ধ করা। 

শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের লালদিঘীর সমাবেশে গত শনিবার রাতে বলেছেন, এ আন্দোলন জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। "জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা আদায় করে ছাড়বো। প্রস্তুত থাকুন। বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। 

আজকের লংমার্চ "সরকারকে সতর্ক করার জন্য" এমন দাবি করে তিনি বলেন, "বাকিগুলো এমন হবে না। এর আগে সকালে কর্মসূচির শুরুতে ঢাকার এক সমাবেশে জোটের অন্যতম দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার এই লংমার্চে বাধা দিলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কুমিল্লায় বলেছেন, "আমরা সরকারকে বলবো-আপনারা দাবিগুলো মেনে নেন। যদি দাবি না মানেন, ছয় দফা একদফা রূপান্তর হবে, সেটা হবে সরকারের পদত্যাগ।" 

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ই আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে 'লং মার্চ' ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান। তার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯শে সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ই অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪শে অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ই নভেম্বর ঢাকায় জোটের মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে। লংমার্চে যা হলো: ১১ দলীয় জোটের ঘোষণা অনু-যায়ী, শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত এ কর্মসূচির পথে পথে বিভিন্ন জনসভা ও পথসভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশের আগে মহীপালের সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, "সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। 

এখন যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদ শুরু করবেন, তাদের ১৫ বছর আর অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করব না। আমরা যেখানে বাধ্য পাব, সেখানেই প্রতিরোধ করব। এতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এলডিপির প্রেসিডেন্ট অলি আহমদসহ জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সবেকার পতনের পর একটি উৎসবমুখর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে কোন প্রকার সময় না দিয়েই পতন আন্দোলনের পেছনে কারা কাজ করছে। স্থানীয়ভাবেও এ ধরণের প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে দেশি-বিদেশি কোন শক্তির হাত তৈরি হচ্ছে কিনা-সে প্রশ্নও উঠেছে। 

এদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছেন, সংসদকে পাশ কাটিয়ে সরকারের ছয় মাসের মাথায় রাজপথে 'লংমার্চে'র নামে বিরোধী দল গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা করছে। গত রবিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনানুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমের কাছে তিনি এ অভিযোগ করেন। 

রিজভী বলেন, বিরোধী দল রাজপথে লং মার্চের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে অশ্রাব্য ও আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করছে। দলটিকে এসব বক্তব্যের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেও দেখা যাচ্ছে, যা স্পষ্টতই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। জনগণের সামনে উচ্চারণ করা যায় না-এমন শব্দও প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিরোধী দল সেটিকে দমন-পীড়ন হিসেবে তুলে ধরে। এভাবে তারা গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজভী। 

তিনি বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দল শুধু সমালোচনা করে যাচ্ছে। অথচ সংকট নিরসনে তাদের কোনো গঠনমূলক প্রস্তাব নেই। সংসদে এ বিষয়ে কোনো পরামর্শ না দিয়ে তারা বাইরে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার মতো ইতিবাচক অর্জনগুলো বিরোধী দল জনগণের সামনে তুলে ধরছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। 

তার দাবি, এসব অর্জন আড়াল করার চক্রান্ত চলছে। রিজভী আরও বলেন, সরকার ব্যর্থ হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে বিরোধীরা রাজপথে আন্দোলন করছে। তবে সাধারণ জনগণ তাদের এই ভূমিকা ভালোভাবে দেখছে না। দায়িত্বশীল বিরোধী দলের মতো সংসদে নিজেদের দাবি ও প্রস্তাব তুলে না ধরে তারা রাজপথকে বেছে নিয়েছে। এটি মূলত সরকারের সার্বিক উন্নয়নকে আড়াল করার অপচেষ্টা।

লংমার্চ ঘিরে সরকারের সহনশীলতার প্রশংসা: লংমার্চ কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন স্থানে যানজট, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও সরকার কোনো ধরনের বাধা দেয়নি। বরং কর্মসূচি নির্বিঘ্নে পালনে প্রশাসন ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ দেড় যুগ পর বিরোধী দলের এত বড় কর্মসূচি কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। 

তাদের মতে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির লংমার্চ, রোডমার্চ, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধা, গ্রেপ্তার ও হামলার অভিযোগ ছিল। এর বিপরীতে বর্তমান সরকার বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ দিয়ে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক পরিবেশের নজির তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, এটি তো একটি গণতান্ত্রিক সরকার। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমার মনে হয় এ সরকারের নীতিটাই এমন যে, ভিন্ন মত দমন করা হবে না। এখানে ভিন্ন মত প্রচার ও প্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, তারা (১১-দলীয় ঐক্য) লংমার্চ করেছে, এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকার কোনো বাধা দেয়নি, বাধা দেওয়ার কোনোরকম চেষ্টাও করেনি। আমি এটিকে খুব ভালো লক্ষণ মনে করি। গণতন্ত্রে এটিই হওয়া উচিত। এজন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই। বিরোধীদলকে বলবো, আপনারা প্রতিবাদ করেন; তবে তা সুশৃঙ্খল এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জামায়াত আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। তারা ছয় মাসের একটি সরকারকে পতন ঘটানোর দাবি তুলছে। এটি তো দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তিনি বলেন, তবে বিএনপি সরকার লংমার্চ করার জন্য তাদের নিরাপত্তা দিয়ে ও কোনো ধরনের বাধা না দিয়ে উদারতার প্রমাণ দিয়েছে। যেটি আমরা বিগত সরকারের সময় দেখিনি।