দখল-চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার
দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তি বিনষ্টকারী দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দখল-চাঁদাবাজির মতো সামাজিক গুরুতর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সম্মেলনে কয়েক দিন দেশের বাইরে থাকাকালীন মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে আলোচিত পাঁচটি ঘটনায় নড়েচড়ে উঠেছে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অপরাধী যেই হোক কিংবা যত বড় রাজনৈতিক ছত্রছায়াই থাকুক না কেন, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জনমনে আস্থা ফেরাতে কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
আরও পড়ুন: উত্তরায় সাবেক এমপির বাসা থেকে ছাত্রলীগের ১৫ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার
মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক দখল, লুটপাট, সালমানের স্টুডিও ভাঙচুর এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় দুটি বাড়ি দখলের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গডফাদার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মূল আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা না হলেও ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। শাহ আলী থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আলোচিত এসব ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৮ মৃত্যু
সরকারের শীর্ষ নির্দেশনায় রাড্ডা ক্লিনিক দখলমুক্ত করে পরিচালকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্লিনিকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। চলছে সংস্কারকাজ। তবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সালমানের স্টুডিও ও নিউ গিনি হাউজিং নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে গণভবনের পেছনের সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠ ঘিরে রেখেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সেখানে বিপুলসংখ্যক ককটেল ও পেট্রোল বোমা উদ্ধারের পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।
গতকাল সোমবার বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠে অভিযান চালায় এসআরবি। অভিযানে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২০টির বেশি ককটেল ও পেট্রোল বোমার সন্ধান পাওয়া গেছে। এসআরবি-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নায়মুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠে অভিযান চালিয়ে এসব বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করতে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে ডাকা হয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষের চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দায়িত্বে রেখে দেশে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন নাহিদ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নেই, তা এখন জনগণের কাছে স্পষ্ট। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায় নিতে হবে।
‘দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অসংলগ্ন বক্তব্য দিয়েছেন। নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়েও তাঁর বক্তব্য নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে,’ বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের কয়েক দিন পর এবার ফিরেছে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সাইনবোর্ড। দখলমুক্ত ঘোষণা করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে হামলার পর টানানো অন্য সাইনবোর্ড। গতকাল সোমবার সকালে ক্লিনিক সংশ্লিষ্টরা সেখানে দখলদারদের লাগানো সাইনবোর্ডটি সরিয়ে দেন। পরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির নিজস্ব সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে হামলা-ভাঙচুরের ক্ষত না শুকাতেই শুরু হয়েছে সংস্কারকাজ। ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন অংশ মেরামতে কাজ করছেন কর্মীরা। তবে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়নি। ক্লিনিকের ভেতরে স্বাস্থ্যকর্মীরা অবস্থান নিয়ে সেবা দিচ্ছেন। পাশাপাশি বাইরে চেয়ার-টেবিল বসিয়েও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার পর তাদের প্রতিষ্ঠানের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এছাড়া ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে, রাজধানীর মিরপুরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শনকালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ৫০ লাখ টাকা অনুদান ঘোষণা করেন।
পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিকভাবে ঘোষণা করা সহায়তা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। এটা দিয়ে শুরু, তবে এটা শেষ নয়। প্রয়োজনে এই এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য আরও যদি কিছু করতে হয়, তাহলে আমরা করব ইনশাআল্লাহ।’
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় অপকর্ম করার সাহস কেউ করবে না।’
তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আর কোনো দুর্বৃত্ত যেন দেশের কোথাও কোনো অসামাজিক অপকর্ম করতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস চলছে। পাশাপাশি রাড্ডার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অপরদিকে, রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বাড়িতে হামলা এবং মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের চেষ্টার পৃথক ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া উইং থেকে পাঠানো পৃথক দুটি বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
ডিএমপি জানায়, শ্যামলী হাউজিংয়ে বাড়িতে হামলার ঘটনায় পাঁচজন এবং চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ও ভুক্তভোগী বাড়ির মালিকের সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল রামদাসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে শ্যামলী হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কের ৪১ ও ৪২ নম্বর প্লটে অবস্থিত একটি বহুতল ভবনে হামলা চালায়।
ভবনটির মালিকের অভিযোগ, এর আগে প্রায় দেড় বছর ধরে একই গ্রুপ ভবনটি দখল করে রেখেছিল। গত মার্চে পুলিশ ওই গ্রুপের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ভবনটির দখল মালিককে বুঝিয়ে দেয়। হামলার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে থাকা লোকজন গেট খুলতে অস্বীকৃতি জানালে মুখোশধারী কয়েকজন রামদা ও ইট দিয়ে মূল ফটক ও জানালায় ভাঙচুর চালায়।
এ ঘটনায় বাড়ির মালিক খুরশিদ আলম খানসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে আদাবর থানায় মামলা করেন।
অন্যদিকে, শনিবার সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কয়েক শ লোক একটি প্লটে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। তারা নগদ টাকা ও যন্ত্রপাতি লুট করে জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে ফেলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমির মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবির জেরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করা হলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে ডিএমপির পৃথক বার্তায় চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় আটজন এবং দুই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছে।





