দোলাচলে ১১ দলীয় ঐক্য
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থেকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বেরিয়ে আসতে পারে বলে গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক ঐক্যে যুক্ত হওয়ার পথ সুগম করতেই দলটি এ অবস্থান নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ার বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অভ্যন্তরীণ ফোরামে সম্মতি মিলেছে। শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে দলটির পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। এমনকি ১১ দলীয় ঐক্যের সামনের লংমার্চ কর্মসূচির প্রস্তুতিতেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অংশ নিচ্ছে। ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকেও দাবি করা হচ্ছে, তাদের ঐক্য অটুট আছে, এতে কোনো ভাঙন ধরবে না। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে না থাকার নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। শিগগিরই এ ব্যাপারে ঘোষণা আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের আশা
কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে গত ২২ অক্টোবর ‘সমমনা ইসলামি দল’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দেওয়া হয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে এগিয়ে চলা এ উদ্যোগে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রস্তাবিত ঐক্যে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সাত দলের কোনোটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন কিংবা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে থাকতে পারবে না—এমন শর্ত রাখা হয়েছে। ফলে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে হলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে বিদ্যমান রাজনৈতিক জোট নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই শর্তের কারণে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছিল। দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকায় সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এখন দলটি জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: শনিবার ৪ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভেতরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা নিয়ে একধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের আলেম-উলামার একটি বড় অংশের মধ্যে এ জোটে দলটির অবস্থান নিয়ে আপত্তিও আছে। অন্যদিকে, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রাখার বিষয়টিও দলটির নেতাদের একাংশের বিবেচনায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ। নতুন ঐক্যে অংশ নিলে কওমি অঙ্গনে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্তের পেছনে ঠিক কোন বিষয়টি প্রধান ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে দলটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দলের আমির মাওলানা মামুনুলসহ শীর্ষ নেতারা এখন মালয়েশিয়া সফরে রয়েছেন। তারা দেশে ফিরলে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। সাত দলের এই রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার উদ্যোগে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় বৈঠক করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও সাত দলের শীর্ষ নেতারা। বৈঠক শেষে নেতারা একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যের কথা জানান। একই সঙ্গে এক মাসের মধ্যে ঐক্যের রূপরেখা জমা দিতে দলগুলোকে বলা হয়। পরে দলগুলো নিজেদের প্রস্তাব জমা দেয়। গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর মাখজানুল উলুম মাদরাসায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর বাবুনগর মাদরাসায় অনুষ্ঠিত আরেক বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে ঐক্যের সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মপদ্ধতির প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। তবে কয়েকটি শর্ত নিয়ে আপত্তি থাকায় সেদিনও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সাত দলের কোনোটি একক সিদ্ধান্তে অন্য কোনো ইসলামি বা অনৈসলামিক দলের সঙ্গে জোট করতে পারবে না। দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হলে সাত দলের মজলিসে শুরা ও উপদেষ্টা পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদাবিরোধী বা ভ্রান্ত বলে বিবেচিত কোনো দলের সভা-সমাবেশে সাত দলের নেতারা অংশ নিতে পারবেন না—এমন শর্তও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়লে কওমি ধারার অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশও বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে। পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কওমি মাদরাসাভিত্তিক কয়েকটি ছোট দলের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের সম্ভাবনার কথা উড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা এবং ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মিন্টো রোডের বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এই কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের ভাঙনের কোনো বিষয় নেই। এ বিষয়ে যে তথ্য প্রচার হচ্ছে, তা প্রোপাগান্ডা। গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ থাকবে সব দল।





