থামছে না মৃত্যু মিছিল, একদিনে ডেঙ্গু ও হামে ঝরল ১৮ প্রাণ
# ডেঙ্গুতে এক দিনে রেকর্ড ১১ জনের মৃত্যু,চলতি বছরে প্রাণহানি ৪০০ জন
# ২৪ ঘণ্টায় হামে ৭ জনের মৃত্যু, নতুন রোগী ১,২৯৫
আরও পড়ুন: বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া
# প্রতিদিন হাজারো শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে আসছে
বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকারের নানামুখী তৎপরতা ও সচেতনতামূলক প্রচারণার পরও কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না এই দুটি সংক্রামক ব্যাধির। একদিকে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে টিকাদানের ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার সুযোগে ইতিহাসের ভয়াবহতম রূপ ধারণ করেছে হামের সংক্রমণ, যা কেড়ে নিচ্ছে শত শত শিশুর প্রাণ। গতকাল ডেঙ্গু ও হামে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮জন। এই দুটি প্রাণঘাতী রোগের সমান্তরাল আক্রমণ দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছে, যা দ্রুত ও কার্যকর মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। এক দিনে আরও ১১ জনের মৃত্যুতে চলতি বছর এডিস মশাবাহিত এ রোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ জনে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২ হাজার ৭১ জনকে নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬ হাজার ৪১৫ জন ডেঙ্গু রোগী। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ বাড়ছে।
আরও পড়ুন: ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের আশ্বাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে পানি জমতে না দেওয়া এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি জনসাধারণের সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।
হামে মৃত্যু কমছেই না। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ গত সোমবার সকাল থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে পরীক্ষায় ৬৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৯৫ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আজ দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৮৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৫৪১। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ১৩৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১০৫।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ৫০৪ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪৮, বরিশালে ১১৬, সিলেটে ১০৮, খুলনায় ৯৬, ময়মনসিংহে ৮৩, রাজশাহীতে ৪১ এবং রংপুরে ৩৬ জন শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে নিশ্চিত হামের ৬৩ জন রোগীই ঢাকা বিভাগে শনাক্ত হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে দুজন করে এবং বরিশাল বিভাগে একজন মারা গেছে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে মৃত ব্যক্তিদের বয়স বা পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ১৫ মার্চ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে নিশ্চিত হামের রোগী সবচেয়ে বেশি, ১৪ হাজার ৮৩৮ জন। চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৪০৮, রাজশাহীতে ১ হাজার ৪২০, সিলেটে ১ হাজার ১১৪, বরিশালে ৮১৩, ময়মনসিংহে ৭৭৫, রংপুরে ৬৬৬ এবং খুলনায় ৫০৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ১২৭ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯০ জন।
যে কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম-ডেঙ্গু: রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু ও হাম জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। এ ধরনের পরিস্থিতি গতানুগতিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নিয়ম রয়েছে। কোভিড মহামারির সময়ও এর নমুনা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা গতানুগতিক রোগের চিকিৎসার জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এভাবে হবে না, হচ্ছেও না। দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পদ্ধতিগত পরিবর্তন না করায় জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে। মুশতাক হোসেন বলেন, হামের টিকা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দিতে হবে। হাম অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার, তা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, কতটি আইসিইউ কিনতে হবে, তা মন্ত্রীর কাছে আছে। কিন্তু এক লাখ আইসিইউ কিনতে পারলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য এক কোটি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী লাগবে। এই পদ্ধতিতে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের অভিযোগ, সরকার টিকাদান কার্যক্রমেও স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করছে না। মানুষকে যেভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেভাবে টিকাদান কার্যক্রমে ফাঁকি দিয়ে ভাইরাস মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ভাইরাসকে এভাবে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। টিকা দিতে হলে মাইক্রোপ্ল্যানিং করতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। যত টাকা ও খরচ প্রয়োজন, তা করতে হবে। তা না হলে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের টিকাদানের যে সুনাম ছিল, তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দলগুলো বলেছে, বাংলাদেশের টিকাদানের সেই সুনাম আর নেই। টিকাদান কার্যক্রমে অনেক অসম্পূর্ণতা রয়েছে।
ডেঙ্গুর টিকা প্রসঙ্গে মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা নিয়ে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কয়েকটি দেশে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। টিকাটি নিরাপদ কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনো টিকাটিকে প্রি-কোয়ালিফিকেশন দেয়নি। অর্থাৎ, টিকাটি নিয়ে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এবং ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সিও টিকাটি অনুমোদন করেনি। অতি উৎসাহী হয়ে টিকাটি চালু করতে গেলে বিপদ হতে পারে। টিকা নেওয়ার পর কেউ মারা গেলে সব টিকাদান কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে এবং স্বীকৃত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
সরকার উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে করণীয় কী, জানতে চাইলে মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারি উদ্যোগে কাজ হবে না, এমন নয়। তবে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্স প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং টিকাদান কার্যক্রম ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মতো কোন কোন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার তালিকাও তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সব রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাঝারি মানের হাসপাতালেও তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখলে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে। আর যেসব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন, তাদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এভাবে স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও একই ধরনের পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ যেসব এলাকায় বেশি, সেসব এলাকায় পরীক্ষা বাড়াতে হবে। পরীক্ষায় যাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হবে, তাদের ১০ দিন বাসায় বিশ্রামে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের বাসায় থাকার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, তাদের জন্য কমিউনিটি সেন্টারে ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মুশতাক হোসেনের মতে, এভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে এবং আইসিইউতে রোগীর চাপও কমবে। ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় এভাবেই স্তরভিত্তিক ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।
রাজধানীর রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল ঘুরে গতকাল দেখা গেছে ৮ তলায় শিশু ওয়ার্ডের নবজাতক ওয়ার্ড-১-এর সামনে বসে আছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ। এর মধ্যে এক নারীর কোলে ৮ মাস বয়সী একটি শিশু ছটফট করছে। গায়ে র্যাশ থাকায় মা-বাবার সন্দেহ শিশুটির হাম হয়েছে। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ধরে তারা এখানেই বসে আছেন, সিট পাচ্ছেন না। শিশুটির নাম নাদিরা। বাবা মো. কামাল হোসেন একবার নার্সদের কক্ষে যান, আরেকবার ডাক্তারদের কক্ষে যান। আকুতি জানান একটি সিটের জন্য। কিন্তু প্রতিবারই বলা হচ্ছে, অপেক্ষা করুন। এদিকে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় কান্না থামছে না শিশু নাদিরা। তাকে অক্সিজেনও দেওয়া হয়নি। মায়ের কোলে টানা ছটফট করছে শিশুটি। নাদিরাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যেখানে বসে আছেন, সেখানেই বারবার আসা-যাওয়া করছেন একদিনের নবজাতক কোলে থাকা মায়েরা। ডেঙ্গু ও নানা রোগে আক্রান্ত বিভিন্ন বয়সের শিশুরাও মায়ের সঙ্গে সেখানে আসছে। তারা খুব সহজেই হাম-আক্রান্ত শিশু জাবেরের সংস্পর্শে চলে আসছে। ওয়ার্ডটির অন্য পাশে ইমার্জেন্সি অক্সিজেন বেডে স্যালাইন লাগিয়ে ৩ বছরের ফয়সালকে শুইয়ে রেখেছেন মা রোমানা আক্তার। ছেলে তার ডেঙ্গু-আক্রান্ত। চার ঘণ্টা ধরে এখানে বসে আছেন তিনি। কেন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে যাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে সিট নেই। নিচেও যে কিছু বিছিয়ে রাখবেন, সে সুযোগও নেই। ছেলে অনেক অসুস্থ, তাকে স্যালাইন দিতেই হচ্ছে। তাই চিকিৎসক এখানে রেখে স্যালাইন দিয়েছেন। ফয়সালের ঠিক দেড়-দুই ফুট দূরত্বে ৫ দিনের নবজাতক কোলে নিয়ে বসে আছেন দাদি পারুল বেগম। দুই ঘণ্টা ধরে নবজাতকটির হাতে ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না থাকায় বাইরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান পারভীন বেগম। গতকাল বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এ চিত্র দেখা যায়। তিন ধরনের রোগীকে প্রায় একই জায়গায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে হাম-আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ আছে এমন রোগীও রয়েছে। ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ২৭০ রোগীর চিকিৎসা চলছে এই ব্যবস্থাপনার মধ্যেই। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ে ভর্তি থাকা শিশুরা একই জায়গায় এসে নার্সদের সেবা নিচ্ছে, স্যালাইন, ইনজেকশন, ওষুধ নিচ্ছে। তাদের কারোরই কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। মুগদা হাসপাতালের ৬০ বেডের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ২৫০-৩০০ রোগী। বিকেলের শিফটে ২৭০ শিশুর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র ২ জন মেডিকেল অফিসার ও ৩ জন নার্স। হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের একই জায়গায় চিকিৎসা দেওয়ায় তৈরি হয়েছে সংক্রমণের বড় ঝুঁকি। শিশু ওয়ার্ডে বিকেলের শিফটে ২৭০ রোগীর চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার ও তিনজন নার্স। জানতে চাইলে ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা.সুমি জাহান বলেন, এই মুহূর্তে আমরা দুইজন এ ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছি। ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে। এটি ৬০ বেডের ওয়ার্ড, কিন্তু সবসময় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকে। হাসপাতালে হামের আলাদা ওয়ার্ড আছে, কিন্তু এখন কোনো সিট খালি নেই। তাই অনেক রোগী এখানে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা। নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও রোগীরা জায়গা নিয়ে অন্যত্র অবস্থান নিয়েছে।





