দিশার সঙ্গে এক বছরের প্রেম, ইয়াবা নিয়ে বিরোধ; তাহসিফের শেষ রাতের বর্ণনা দিলেন দীপ

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ন, ০২ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:১৩ অপরাহ্ন, ০২ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিকা জারিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে বিরোধ, বারে মদ্যপান এবং পরে টঙ্গীতে হেরোইন কিনতে যাওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, দিশার সঙ্গে তাহসিফের প্রায় এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। অন্য এক যুবকের সঙ্গে দিশার ইয়াবা সেবন ও শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে তাহসিফ মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। এ নিয়ে ঘটনার রাতে তাঁদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে হেরোইন সেবনের কথা বলে টঙ্গীর একটি মাদক স্পটে যান তাহসিফ।

আরও পড়ুন: ২০২৭ সালে সরকারি ছুটি ২৯ দিন, অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা

তবে তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে ধারণা করা হলেও হত্যার সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ

আরও পড়ুন: আন্দোলনের নামে সহিংসতায় জড়িতদের উদ্দেশ্য ভিন্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটের দিকে তাহসিফ, দিশা ও দীপ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান।

দীপের দাবি, ঘটনার কয়েক দিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন দিশা। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে তাঁর শারীরিক সম্পর্কও হয়েছিল বলে জানতে পারেন তাহসিফ। বিষয়টি নিয়ে তিনি মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন।

বারে যাওয়ার পর তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে সাউন্ড সিস্টেমে বিষণ্ন সংগীত বাজাতে বলেন। পরে তাঁরা মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ, দিশা ও দীপ বারে অবস্থান করেন।

এ সময় দিশার সঙ্গে অন্য যুবকের ইয়াবা সেবন ও একসঙ্গে রাত কাটানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেন তাহসিফ। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’

টঙ্গীর মাদক স্পটে গিয়ে হেরোইন সেবন

দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান।

পরে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। ওই মাঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন দীপ।

মাঠের পাশে বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা মাঠের দিকে যান। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতি ছিল। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, ‘কার কার কাছে হেরোইন আছে, নিয়ে আসো। যত টাকা লাগে আমি দেব।’

পরে কয়েকজন মাদক কারবারি তাঁদের কাছে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে মাদক কিনে সেবন করেন তাহসিফ। বারে মদ্যপানের পর মাদক সেবন করায় একপর্যায়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি বলে দাবি করেছেন দীপ।

পুলিশের উপস্থিতিতে পালিয়ে যান দীপ

দীপ জানান, তাহসিফ যখন মাঠে মাদক সেবন করছিলেন, তখন সেখানে পুলিশের একটি টহল দল আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। একই সঙ্গে দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান।

পরে নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন তিনি। তাঁর ধারণা ছিল, সেখানে লুকিয়ে থাকলে পুলিশ তাঁকে খুঁজে পাবে না।

দীপের দাবি, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু বলে পরিচয় দেন। এ সময় নিজের বাড়ি মোহাম্মদপুর বলে জানান।

পুলিশ তাঁকে এত রাতে সেখানে থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি তাহসিফের সঙ্গে একটি কাজে এসেছেন বলে জানান। পরে পুলিশ তাঁকে বাসায় চলে যেতে বললেও তিনি পুলিশের পেছনে না গিয়ে বস্তির একটি সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে চলে যান।

তদন্ত কর্মকর্তাদের দীপ জানান, বিভিন্ন সময় ট্রাফিক পুলিশের হাতে আটক হলে নিজেকে বাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন তিনি। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সেদিন রাতেও একই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।

পরে এক মাদকসেবীর সহায়তায় বস্তি থেকে মূল সড়কে আসেন দীপ। এরপর নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে ফোন করেন। তবে প্রতিবারই তাঁর ফোন বন্ধ পান।

দীপের ধারণা হয়েছিল, তাহসিফ হেরোইন সেবন করতে গেছেন, তাই মাদক সেবন শেষ না করে ফিরবেন না। এ ছাড়া এর আগে তাহসিফ তাঁর কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। তাই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেছিলেন তিনি।

পরে নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন দীপ। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।

প্রাথমিক তদন্তে হত্যার আলামত মেলেনি

তদন্তসংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং তাঁর বক্তব্য যাচাই করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারের ঘটনাও যাচাই করেছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর ধারণা, পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় মাদকের প্রভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পানিতে পড়ে যেতে পারেন।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, এখনো নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না। দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়া তাহসিফের শরীরে মাদক বা বিষজাতীয় কোনো পদার্থ ছিল কি না, তা পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে।

মরদেহে আঘাতের চিহ্ন নেই, পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে নমুনা

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে ময়নাতদন্তের সময় তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি রক্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সাধারণত তাঁর সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিস্থিতিতে তিনি পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কাটার সক্ষমতা ছিল না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বের হন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)।

ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে আর বাসায় ফেরেননি। রাত ১টার দিকে তাঁর মোবাইল ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিসি আসতেছি’।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর আসে, তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। খবর পেয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে।

প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উদ্ধার করা হলেও পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ২৯ অক্টোবর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

দীপ ও দিশা রিমান্ডে, তদন্তে নতুন তথ্য

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

এদিকে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

পরে দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় নৌপুলিশ। ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অন্যদিকে, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে নেস্ট বারে যাওয়া তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকে ১ নভেম্বর কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়া, পুলিশের উপস্থিতিতে দীপের পালিয়ে যাওয়া এবং পরে তাহসিফের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়গুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে তাহসিফের মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা।