সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ন, ০১ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৫ অপরাহ্ন, ০১ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং মৎস্যসম্পদের প্রজননকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সোমবার (১ জুন) থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনাঞ্চলটিতে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ ও পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারীসহ কোনো পেশাজীবী প্রবেশ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও সুন্দরবন ভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে।

আরও পড়ুন: আখাউড়ায় কবীর আহমেদ ভূঁইয়া ফুটবল টুর্নামেন্টের মেগা ফাইনালে নেতৃবৃন্দের মিলনমেলা

বনের মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে আসছে সরকার। তবে পাঁচ বছর পর এবার এ সিদ্ধান্তে আংশিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, নিষিদ্ধকালীন সময়েও ‘করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র’ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, করমজল পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে পর্যটক প্রবেশে বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী বা মৎস্যসম্পদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির আশঙ্কা নেই। সে বিবেচনায় কেন্দ্রটি খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: বোনের সঙ্গে গোসলে নেমে লক্ষার খালে তলিয়ে গেল ফারিয়া

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, বনজীবীদের নৌযান চলাচল, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, পর্যটকবাহী ট্রলারের শব্দ এবং মানুষের উপস্থিতির কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বন বিভাগ জানিয়েছে, এ সময়ে কোনো ধরনের পাস-পারমিট ইস্যু করা হবে না। কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে বন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে।

তবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বন থেকে আহরণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগারের পথও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামী তিন মাস পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন বনজীবীরা।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় বন বন্ধ থাকায় জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেককে মহাজন বা বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা না পাওয়ায় প্রতি বছরই নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হয়।

অন্যদিকে কিছু বনজীবী দাবি করেছেন, বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয় না। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কিছু জেলে অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করে থাকে। এছাড়া অবৈধ নেটজাল দিয়ে মাছের পোনা নিধনের ঘটনাও চলমান রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস। তবে গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বনজসম্পদ আহরণ কমে যাওয়ায় বননির্ভর মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি বননির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নিষিদ্ধকালীন সময়ে সরকারি খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৩১ শতাংশ জলভাগ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটিতে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ।

প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি জেলেনৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) সংগ্রহ করে। বন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে নিবন্ধিত বনজীবীর সংখ্যা ৫ হাজার ৮০০ এবং পশ্চিম বিভাগে ৬ হাজার ৩১০। এছাড়া প্রতিবছর ২ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।