দ্বিগুণ টোলের জেরে পাটলাই নদীতে নোঙর ৩০০ নৌযান

পাঁচ দিন ধরে স্থবির কয়লা-চুনাপাথর পরিবহন, দুর্ভোগে দুই হাজার শ্রমিক

Sanchoy Biswas
মো. সাজ্জাদ হোসেন শাহ্, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশিত: ৯:৫২ অপরাহ্ন, ০৫ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার পাটলাই নদীতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) টোল বৃদ্ধির প্রতিবাদে টানা পাঁচ দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন আমদানিকৃত কয়লা ও চুনাপাথরবাহী নৌযানের মাঝি-শ্রমিকরা। প্রায় ৩০০ নৌযান নদীতে নোঙর করে রাখায় ভারত থেকে আমদানিকৃত কয়লা ও চুনাপাথরের পরিবহন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শত শত ব্যবসায়ী, আর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় দুই হাজার নৌ-শ্রমিক।

শ্রমিকদের অভিযোগ, গত ১ জুলাই থেকে বিআইডব্লিউটিএর ইজারাদার প্রতিষ্ঠান চলন্ত নৌযান থেকেই আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে টোল আদায় শুরু করেছে। কোনো পূর্বঘোষণা, আলোচনা বা নৌযান মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় ছাড়াই নতুন টোল কার্যকর করায় তারা বাধ্য হয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখে আন্দোলনে নেমেছেন।

আরও পড়ুন: শ্যামনগরে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনতাই

স্থানীয় বাসিন্দা ও নৌযান চালকদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএর বিধিমালা অনুসরণ না করে চলন্ত নৌযান থামিয়ে টোল আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের স্বত্বাধিকারী নাছির মিয়া প্রায় দ্বিগুণ ইজারামূল্যে ঘাটটি নিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ইজারামূল্য বৃদ্ধির চাপই এখন টোল বৃদ্ধির মাধ্যমে নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তবে নাছির মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, গত বছর ঘাটটির ইজারামূল্য ছিল ৪ কোটি টাকা, যা এ বছর বেড়ে ৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ইজারামূল্য বাড়ায় বিআইডব্লিউটিএই টোলের হার বৃদ্ধি করেছে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এক সপ্তাহের জন্য প্রতি ফুট ৫০ টাকা এবং পরে ৭০ টাকা হারে টোল নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা আবারও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদক পেলেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতি টন কয়লা ও চুনাপাথরের জন্য ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা টোল নেওয়া হতো। এখন প্রতি টনে ৭০ টাকা আদায়ের দাবি করা হচ্ছে। এতে প্রতিটি নৌযানকে প্রতি ট্রিপে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে বলে দাবি করছেন নৌযান মালিকরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাল্কহেডের মাঝি আনু মিয়া জানান, ২৭০ টন চুনাপাথর নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর পাটলাই নদীর টোলঘাটে এসে তিনি নতুন টোলের বিষয়টি জানতে পারেন। অতিরিক্ত টোল দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি নৌযান নদীতেই নোঙর করে আন্দোলনে যোগ দেন।

পাঁচ দিন ধরে নদীতে আটকে থাকা শ্রমিকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই নদীর পানি ব্যবহার করছেন। বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে ছোট নৌকা ভাড়া করতে হচ্ছে। কেউ একবেলা খেয়ে, কেউ আবার না খেয়েই দিন কাটাচ্ছেন।

বাজিতপুরের নৌ-শ্রমিক হাসান মিয়া বলেন, "প্রচণ্ড গরমে স্টিলের তৈরি বাল্কহেডের ওপর থাকা খুবই কষ্টকর। ডেক এতটাই গরম হয়ে যায় যে সেখানে দাঁড়ানোও যায় না। তাই বারবার নদীর পানি তুলে ডেকে ঢালতে হচ্ছে। ঠিকমতো খাবারও জুটছে না।"

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত টোল দিতে রাজি না হলে ইজারাদারের লোকজন আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, এমনকি মারধর করে বাথরুমে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।

ভৈরবের নৌ-শ্রমিক কাশেম মিয়া বলেন, "এভাবে নদীতে পড়ে থাকার চেয়ে জেলখানায় থাকাও ভালো। সেখানে অন্তত সময়মতো খাবার পাওয়া যায়। এখানে আমাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই।"

রোববার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাটলাই নদীর বিভিন্ন স্থানে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে আছে শত শত পণ্যবাহী বাল্কহেড। পরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

দ্বিগুণ টোল আদায়ের বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএর জেটিতে উপস্থিত কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মতিউর রহমান খান বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রোববার বিকেলে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ, ইজারাদার, নৌচালক, শ্রমিক এবং আমদানিকারক সমিতির নেতৃবৃন্দ এখনও সেখানে রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা জানতে পারেননি। তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন। পরে বিস্তারিত জানাবেন।

এদিকে আন্দোলনরত নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার বা যৌক্তিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ফলে পাটলাই নদীপথে কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহন কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।