৬ মাসে ২৪ হাজার কার্টন বিদেশি সিগারেট, পৌনে ৯ হাজার পিস বিউটি ক্রিম, ২৩৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ১৭ ধরনের পণ্যে
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাতটি আন্তর্জাতিক রুট পরিচালিত হচ্ছে। জেদ্দা, মক্কা-মদিনা, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও মাস্কাট—এই রুটগুলোর মধ্যে অন্তত পাঁচটি রুট ব্যবহার করে নিয়মিত চোরাই সিগারেট আনার চেষ্টা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটগুলো। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রবণতা চললেও সম্প্রতি বিষয়টি স্পষ্টভাবে নজরে আসে। এরপরই বিশেষ নজরদারি শুরু করা হয়।
বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ব্যাগেজ রুলসের অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা গেছে। বিগত ৬ মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬) মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের লাগেজে তল্লাশি চালিয়ে সাড়ে ২৪ হাজার কার্টনের বেশি বিদেশি সিগারেট, পৌনে ৯ হাজার পিস বিউটি ক্রিম ও ২৩৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করেছে কাস্টমস। বিমানবন্দর কাস্টমসের মালামাল জব্দের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: খাগড়াছড়ির পানছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে ৩ জন নিহত
এক সময় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ত স্বর্ণের বার। কিন্তু গত এক বছরে দৃশ্যপট বদলেছে। এখন বিমানবন্দরজুড়ে চোরাচালানের সবচেয়ে বড় পণ্য হয়ে উঠেছে বিদেশি সিগারেট। এরপর রয়েছে নিষিদ্ধ কসমেটিকস এবং উচ্চ শুল্কের ইলেকট্রনিক পণ্য।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে ২০ টাকা মূল্যের একটি সিগারেটের শলাকায় প্রায় ১৭ টাকার মতো শুল্ক আরোপিত হয়। অর্থাৎ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। একটি ১০ প্যাকেটের কার্টন সিগারেটে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত লাভের সুযোগ থাকায় চোরাকারবারিদের কাছে এটি দ্রুত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, স্বর্ণ চোরাচালানের তুলনায় সিগারেট পাচারের আইনি ঝুঁকি কম এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে কম কঠোর হওয়ায় সিন্ডিকেটগুলো নতুন কৌশলে এই খাতে সক্রিয় হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জামালপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড, একজন খালাস
বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ১৭ ধরনের পণ্য শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিদেশি সিগারেট, নিষিদ্ধ কসমেটিকস, মোবাইল ফোন, ই-সিগারেট ও ভ্যাপ, মদ ও মদজাত দ্রব্য, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক পণ্য, বিউটি ক্রিম, ফার্স্ট এইড বক্স, সার্ভার, হুক্কা, পিসিবি, টেলিভিশনসহ অন্যান্য উচ্চ শুল্কের পণ্য। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি জব্দ হচ্ছে সিগারেট ও কসমেটিকস।
এদিকে, সিগারেটের পাশাপাশি ব্যবসার উদ্দেশ্যে কসমেটিকস বা রূপচর্চার ক্রিম নিয়ে আসার হারও সমানতালে বেড়েছে। কাস্টমসের তালিকায় সাধারণ বিউটি ক্রিমের পাশাপাশি ‘গৌরি ক্রিম’ এবং হোয়াইটেনিং সিরামের বড় সংখ্যার উল্লেখ রয়েছে। গত ৬ মাসে বিমানবন্দরটিতে মোট ৮ হাজার ৭৫৬ পিস ক্রিম ও সিরাম জব্দ করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ১ হাজার ৬৪৯ পিস বিউটি ক্রিম, জানুয়ারিতে ৫৮১ পিস বিউটি ও গৌরি ক্রিম এবং ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ২১৪ পিস বিউটি ক্রিম জব্দ করে কাস্টমস। মার্চ মাসে ৯২২ পিস বিউটি ক্রিম এবং ১৮ পিস গৌরি ক্রিম আটক করা হয়। অন্যদিকে, এপ্রিলে ৬৫২ পিস বিউটি ক্রিম, ২০৯ পিস গৌরি ক্রিম ও ১৩৮ পিস হোয়াইটেনিং সিরাম এবং মে মাসে এক চালানেই ২ হাজার ৭৫১ পিস বিউটি ক্রিম জব্দ করা হয়।
একই সময়ে বিমানবন্দরে সাধারণ সিগারেটের বাইরেও তরুণদের জন্য ক্ষতিকর ও আমদানিতে কড়াকড়ি থাকা ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হুক্কা এবং গুটখার মতো মাদকজাতীয় পণ্যও নিয়মিত ধরা পড়ছে। গত ডিসেম্বরে একসাথেই ৩১১ পিস ই-সিগারেট জব্দ করা হয়। এছাড়া জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ই-সিগারেটের পার্টস, ভ্যাপ, গুটখা ও জর্দার চালান জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ছয় মাসে কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসার সময় মোট ২৩৭ বোতল বিদেশি মদ আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণত চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে বড় বড় সোনার চালান আসার খবর আলোচনায় থাকলেও এই ছয় মাসের কাস্টমস তালিকায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তালিকায় শুধু ডিসেম্বর মাসে ২২.১৯ গ্রাম এবং জানুয়ারি মাসে ১১১ গ্রাম কাস্টমস ইউনিট ও ৯১ গ্রাম এয়ারফ্রেইট ইউনিট কর্তৃক সোনা জব্দের তথ্য রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ২০ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯০ টাকা। বাকি ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই চার মাস বিমানবন্দরটিতে কোনো সোনা জব্দের উল্লেখ নেই।
বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সোনা চোরাচালানে আইনি জটিলতা ও শাস্তি অনেক বেশি হওয়ায় পণ্যের ধরন বদলে কসমেটিকস বা সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে একটি চক্র। কারণ, নামী ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট এবং পাকিস্তানি বা ভারতীয় বিউটি ক্রিমের ব্যাপক চাহিদা ও লাভ বেশি থাকায় সাধারণ যাত্রীদের লাগেজে লুকিয়ে এগুলো আনা তুলনামূলক সহজ।
বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারির বিষয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর বলেন, দেশের ২য় বৃহত্তম চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে যেকোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি বা অবৈধ পণ্যের প্রবেশসহ মুদ্রা পাচার ঠেকাতে কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো অনিয়ম প্রতিরোধে আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
বিমানবন্দরটির জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে যেকোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি বা অবৈধ পণ্য বহন বাধাগ্রস্ত করতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং এভিয়েশন সিকিউরিটি যৌথভাবে কাজ করায় সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধভাবে আনা প্রচুর কমার্শিয়াল পণ্য বিমানবন্দরের কাস্টমস হলে আটক হচ্ছে। দুঃখজনক হলো, অনেক সময় সাধারণ প্রবাসীরা না বুঝেই চোরাকারবারি চক্রের ফাঁদে পড়ে নিজেদের লাগেজে এসব বাণিজ্যিক পণ্য বহন করেন, যা আইনত দণ্ডনীয়। আমরা প্রতিনিয়ত যাত্রীদের এ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছি, যাতে তারা অন্য কারও দেওয়া প্যাকেট বা পণ্য না আনেন।
পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে চোরাচালান বন্ধ হয়নি—বরং পণ্যের ধরন ও পদ্ধতি বদলেছে। স্বর্ণের জায়গায় এখন সিগারেট এসেছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটিকে শুধু রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, চোরাচালান চক্র সাধারণত একটি পণ্যের আড়ালে আরেকটি পণ্যের প্রবেশপথ তৈরি করে। ফলে নজরদারি শুধু জব্দ অভিযানে নয়, সিন্ডিকেট শনাক্ত ও রুটভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণেও বাড়ানোর দাবি উঠছে।





