কয়রায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

Sadek Ali
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১:০৬ অপরাহ্ন, ২১ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৬ অপরাহ্ন, ২১ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ৩০ কেজি চালের পরিবর্তে তাঁদের দেওয়া হচ্ছে ২ থেকে ৩ কেজি কম। একই সঙ্গে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া এবং চাল নিতে গেলে বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে আসতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগ তুলে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক রেশন কার্ডধারী কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলন নেতার হত্যার প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ, তীব্র যানজট

কয়রা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখের বরাদ্দসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে সংশ্লিষ্ট ডিলারের আওতায় মোট ৪১৮টি কার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মৃত কার্ড বাদ দিয়ে ৪০৬টি কার্ডের বিপরীতে ১২ দশমিক ১৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মোট ১২ হাজার ১৮০ কেজি চাল ৪০৬টি কার্ডে বিতরণের কথা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে একজন সুবিধাভোগীর ৩০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা।

তবে সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, বাস্তবে তাঁরা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ৩০ কেজির পরিবর্তে ২৭ থেকে ২৮ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

আরও পড়ুন: পিরোজপুরে খাল-বিলে অভিযান, বিপুল পরিমাণ চায়নাদুয়ারি জাল জব্দ

এ ছাড়া কার্ড দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেক সুবিধাভোগীর কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অফিস খরচসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এ টাকা নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী মো. আসাদুর রহমান, হালিমা, কালিপদ, মহাসিনসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, কার্ডের কথা বলে আমাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, চাল বিতরণের সময় সরকার নির্ধারিত ৩০ কেজি চালের বস্তা না দিয়ে বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে আসতে বলা হয়। বস্তা নিয়ে না গেলে চাল দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। চাল বিতরণের সময় সুবিধাভোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রত্যেক কার্ডে ২ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত চাল কম দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সবুর বলেন, এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে জানান। চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি সংশ্লিষ্ট ডিলারকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চান।

ইউপি সদস্য সবুর বলেন, ডিলার প্রথমে অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে আমার কাছে অনিয়মের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানতে চান, কীভাবে এর পরিত্রাণ হবে। আমি তাঁকে সবার টাকা ফেরত দিয়ে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে আর এমন করবেন না বলে জানানোর পরামর্শ দিয়েছি।

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলামও অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমিও অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সতর্ক করার পরও তিনি একই ধরনের কাজ করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়রা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেপ্রসাদ দাশ বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স সালমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল্লাহ সানার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

সরকারি নথিতে ৪০৬টি কার্ডের বিপরীতে ১২ দশমিক ১৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু সুবিধাভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, যদি প্রতিটি কার্ডে ২ থেকে ৩ কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বরাদ্দের সেই ঘাটতি কোথায় গেছে, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই অর্থ নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান বা অনুমোদন রয়েছে কি না, তদন্তে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

অভিযোগকারীরা বলছেন, তদন্ত যেন শুধু কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিতরণ রেজিস্টার, ডিলারের স্টক রেজিস্টার, চাল উত্তোলনের চালান, সুবিধাভোগীদের কার্ড ও তালিকা যাচাইয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে চালের পরিমাণ ওজন করে দেখা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।