কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলের বধ্যভূমিতে ৫৬ বছর পর স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ

Sadek Ali
‎এম.এ. কিবরিয়া, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:৪৯ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২:৩৮ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল উপজেলা ইটনার জয়সিদ্ধিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভয়রা বদ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দীর্ঘদিনের অরক্ষিত এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এর পাশাপাশি, মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ সিরাজুল ইসলামের স্মৃতি রক্ষা করতে তাঁর নিজ গ্রাম ছিলনীর নাখেরাজে একটি পাঠাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

‎​সম্প্রতি ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর সরজমিনে ভয়রা বদ্যভূমি এবং শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রমের গ্রাম পরিদর্শন করেন। এই সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক রওশন আলী রশো, বীর মুক্তিযোদ্ধা নবী হোসেন তজু মিয়া এবং ইটনা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলামসহ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।

আরও পড়ুন: রংপুরে শিক্ষকসহ চার খুন: মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যার দাবি, আটক ২

‎স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ইটনার ভয়রা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকারদের একটি নৃশংস হত্যাকেন্দ্র। হাওরাঞ্চলের নদীঘেঁষা ও তুলনামূলক নির্জন হওয়ায় স্থানটি হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হতো বলে স্থানীয়দের দাবি।

‎‎তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে ভয়রা বধ্যভূমিতে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হতো। অনেকের মরদেহ নদী ও ডোবায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো অথবা মাটিচাপা দেওয়া হতো।

আরও পড়ুন: বগুড়ার শেরপুরে সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না সার, কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ

‎‎স্থানীয়দের মতে, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বধ্যভূমিটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কোনো দৃশ্যমান স্মৃতিফলক না থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানটির ইতিহাস অনেকটাই অজানা।

‎‎মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শহীদ সিরাজুল ইসলামকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। প্রতিবছর ৮ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হয়।

‎১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট সুনামগঞ্জের সাচনা বাজারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রম। তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে নিজ গ্রামে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

‎উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

‎তাদের দাবি, ভয়রা বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সংরক্ষণ করা হোক। এতে স্থানটি শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে গড়ে উঠবে।

‎‎দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকা ভয়রা বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, স্বাধীনতার এত বছর পর হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই বধ্যভূমির স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

‎‎স্থানীয়দের ভাষ্য, ভয়রা বধ্যভূমি শুধু একটি হত্যাস্থল নয়; এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাওরাঞ্চলের মানুষের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী। তাই যথাযথভাবে স্থানটি সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতিফলক নির্মাণের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন।

‎ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “প্রাথমিকভাবে অরক্ষিত বধ্যভূমিটিতে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ এবং শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রমের নামে তাঁর নিজ গ্রামে একটি পাঠাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।”

‎উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভয়রা বধ্যভূমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসবে এবং শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রমের স্মৃতিও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।