কুমিল্লা প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা, কাশবনে জমছে স্মৃতি ও তারুণ্যের গল্প
শরৎ এলেই প্রকৃতির রূপ বদলে যায়। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মৃদু বাতাস আর মাঠজুড়ে দুলতে থাকা কাশফুল জানান দেয় ঋতুর পরিবর্তনের কথা। সেই চিরচেনা শরতের সৌন্দর্য এবার আরও বিশেষভাবে ধরা দিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সবুজ ক্যাম্পাসে।
কুবির বিভিন্ন প্রান্তে ফুটে থাকা সাদা কাশফুলে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ তুলছেন একক ছবি, আবার কেউ ক্যামেরাবন্দি করছেন ক্যাম্পাসের প্রকৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে কাশফুল ঘেরা ক্যাম্পাসের নানা মুহূর্ত। ফলে কাশফুল শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, এটি হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ধরে রাখারও এক অনন্য মাধ্যম।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ব্যাংকে গ্রাহকের ৪ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার ১
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া রিক্তি বলেন, “কাশফুল শুধু শরতের সৌন্দর্য নয়, এটি নগরজীবনের ব্যস্ততায় আমাদের মানসিক প্রশান্তির এক বড় উৎস। ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক শহরে কাশবনে দাঁড়ালে মনে হয়, প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। বাতাসের দোলায় দুলতে থাকা এই সাদা ফুলের সারি যেন আমাদের শেখায়—সব কোলাহল ভুলে কীভাবে সহজ-সরল ও স্নিগ্ধ থাকা যায়।”
বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট খেলতে মাঠে আসেন। মাঠজুড়ে খেলোয়াড়দের দৌড়ঝাঁপের পাশেই কিছু দূরে বাতাসে দুলতে থাকে সাদা কাশফুল। একদিকে খেলোয়াড়দের প্রাণবন্ত ছুটে চলা, অন্যদিকে নীরবে দুলতে থাকা কাশফুল—দুটি ভিন্ন দৃশ্য মিলেমিশে তৈরি করছে ক্যাম্পাসের এক মনোরম পরিবেশ।
আরও পড়ুন: খুলনায় যুবককে গুলি করে হত্যা
বাংলা সাহিত্যেও শরৎ ও প্রকৃতি বারবার ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতিচেতনায় শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়; এটি নির্মলতা, আলো ও অনুভূতির এক বিশেষ সময়। তাঁর ‘আজি শরৎ-তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়’—এই পঙ্ক্তির অনুভূতিটি যেন শরতের মনের কথাই বলে।
শরৎ এলে মানুষের মনও অকারণে কিছু একটা খুঁজতে থাকে। কী হারিয়েছি, কী ফিরে পেতে চাই—তার স্পষ্ট উত্তর হয়তো থাকে না। তবুও শরতের নির্মল আকাশ, সাদা মেঘ আর কাশফুল মানুষের মনে তৈরি করে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া।
জীবনানন্দ দাশের বাংলাও এমন এক প্রকৃতির বাংলা, যেখানে মাঠ, ঘাস, নদী, পাখি আর ঋতুর পরিবর্তনের মধ্যে মিশে থাকে স্মৃতি ও মায়া। আর কাজী নজরুল ইসলামের প্রকৃতিপ্রেমে প্রকৃতি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও গতিশীল। এসব সাহিত্যিকের কাছে প্রকৃতি কখনো শুধু দৃশ্য নয়; মানুষের অনুভূতি ও জীবনবোধেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কাশফুলের সঙ্গে বাঙালির শৈশবের সম্পর্কও গভীর। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’-তে দুর্গা ও ছোট ভাই অপু কাশবনের ভেতর দিয়ে ছুটে যায় ট্রেন দেখতে। কাশের সাদা ঢেউ পেরিয়ে তাদের সেই ছুটে চলা যেন গ্রামবাংলার শৈশবের নির্মল কৌতূহলকে ধারণ করে।
ট্রেনটি শুধু একটি ট্রেন নয়; ছোট্ট অপু-দুর্গার কাছে সেটি ছিল পরিচিত পৃথিবীর বাইরে থাকা বিশাল অজানা জগতের এক ইশারা। আর কাশবনের ভেতর দিয়ে তাদের সেই ছুটে চলা হয়ে ওঠে প্রকৃতি, শৈশব, বিস্ময় ও স্বপ্নের এক অনন্য দৃশ্য।
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী আরিয়ান শাহীন বলেন, “কুবির পথে আজ কাশফুলেরা যেন পুরোনো কোনো গল্প বলে। শরতে সাদা মেঘে মিশে যায় কত না-বলা অনুভূতি। এই ক্যাম্পাস শুধু স্মৃতির ঠিকানা নয়, হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক টুকরো ভালোবাসা—যেখানে কাশফুল দোলে, আর মনটা বারবার ফিরে যেতে চায়।”
শরৎ একদিন চলে যাবে। কাশফুলও ঝরে পড়বে। তবুও নতুন দিনের শরতের বাতাসে দুলতে থাকা একটি সাদা কাশফুল ফিরিয়ে দেবে সেই পুরোনো দিনে। সেদিন হয়তো আবার মনে হবে—জীবন, সাহিত্য আর শরতের মেঘের মতোই; আসে, কিছুক্ষণ থাকে, তারপর চলে যায়। কিন্তু রেখে যায় কিছু স্মৃতি।





