সিলেটে বিআরটিসির ফ্রি ড্রাইভিং কোর্সে অনিয়মের অভিযোগ

তিন হাজার টাকায় পরীক্ষায় পাশ, দিতে হয় না স্বাস্থ্য সনদ

Shahrier Islam Pallab
জুলফিকার তাজুল, সিলেট
প্রকাশিত: ৭:৩৪ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৪ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • ভাতার টাকা বঞ্চিত প্রশিক্ষণার্থীরা
  • জাল সিল ব্যবহারের অভিযোগ
  • ভুয়া জ্বালানি বিলের অভিযোগ
  • হাজিরায় অনুপস্থিতরাও উপস্থিত

সরকারি খরচে বিনামূল্যে ড্রাইভিং ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও সিলেটের আলমপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়, স্বাস্থ্য সনদ জালিয়াতি, প্রশিক্ষণের জ্বালানি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, ভাতা না দেওয়া এবং অনুপস্থিত প্রশিক্ষণার্থীদের হাজিরা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রটির ট্রেনিং ইনচার্জ মাহবুব রহমানের বিরুদ্ধে। সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট (বিআরএসপি) এবং অর্থ বিভাগের এসআইসিআইপি প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রটিতে চার মাস মেয়াদি ‘মোটরযান ড্রাইভিং ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী, প্রশিক্ষণটি বিনামূল্যে হওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ২৫০ টাকা যাতায়াত ভাতা, চার মাসে এককালীন ৪ হাজার টাকা টিফিন ভাতা এবং কোর্স শেষে বিনামূল্যে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স ও সনদ দেওয়ার কথা। প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, কোর্স শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো ও দ্রুত লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী। তাদের দাবি, টাকা দেওয়ার পরও অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও লাইসেন্স, সনদ ও বকেয়া ভাতা পাননি। দুই নারী প্রশিক্ষণার্থী গত ৩ আগস্ট বিআরটিসির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তাদের অভিযোগ, মাহবুব রহমান তাদের কাছ থেকে কয়েক দফায় যথাক্রমে ১৩ হাজার ৪০২ ও ৯ হাজার ৫২৬ টাকা নেওয়ার পরও আট মাসেও সনদ, লার্নার কপি ও লাইসেন্সের কপি দেওয়া হয়নি। একই অভিযোগে গোয়াইনঘাটের গোলাম সাদিক ৩২ জন প্রশিক্ষণার্থীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করেন। তার দাবি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ৩২ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য সনদ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সনদ নেওয়ার পরিবর্তে মাহবুব রহমান নিজেই একজন চিকিৎসকের নামে তৈরি করা সিল ব্যবহার করে আই টেস্ট সনদ দিয়েছেন। প্রতিবেদকের কাছে থাকা নথি ও তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত সিলে থাকা বিএমডিসি নম্বর অনুসন্ধান করলে ভিন্ন একজন চিকিৎসকের তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।


আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বেদখলে থাকা ২৯ শতক সরকারি জমি উদ্ধার

আরও পড়ুন: বগুড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল ভারসাম্যহীন গৃহবধূর


প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। তাদের দাবি, নির্ধারিত জ্বালানির তুলনায় মাঠপর্যায়ে গাড়ি চালানোর জন্য অনেক কম জ্বালানি ব্যবহার করা হলেও বাকি অংশের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত এবং এমনকি বিদেশে চলে যাওয়া কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীকে হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখিয়ে ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। নতুন ব্যাচে ভর্তি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রার্থী। তাদের দাবি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরও যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার পরীক্ষার দিন অনুপস্থিত থাকা কয়েকজনের রোল নম্বর চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এ ছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিলেও ২৩ জন আনসার সদস্যকে বিআরটিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে মাহবুবের বিরুদ্ধে ৫৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় আনসার ব্যাটালিয়ন শ্রীমঙ্গলের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগের বিষয়ে মাহবুব রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। এসব বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন। বিআরটিসি সিলেট বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ম্যানেজার (অপারেশন ও ট্রেনিং) মো. রোকনুজ্জামান বর্তমানে দাপ্তরিক কাজে দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এমন অভিযোগের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী প্রশিক্ষণার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহল। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকল্পের সুবিধা প্রকৃত প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।