পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিন কমিটি বাতিলসহ ৮ দফা দাবি নাগরিক সমাজের
সাম্প্রতিক চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ৩ টি আলাদা জাতীয় কমিটি গঠন করার প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের উদ্যোগে সোমবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় সংগঠনের যুগ্ন সমন্বয়কারী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান, এএলআরডি নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী কল্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল প্রমুখ।
আরও পড়ুন: কুবি ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের মতবিনিময়
আবু সাঈদ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। একটি দেশের কোনো জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকে, তাহলে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। পাহাড়ের মানুষ অস্ত্র ছেড়েছে বলে তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা করা যাবে এমন ধারণা ভুল। পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে এবং তাদের আবার অস্ত্র ধরতে বাধ্য করা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আলোচনা হলেও সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। বর্তমানে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। দলটি একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাতিলের কথা বললেও ক্ষমতায় থাকাকালে চুক্তি বাতিলের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটির সমালোচনা করে শামসুল হুদা বলেন, এসব কমিটি মূলত আমলা ও গোয়েন্দা-নির্ভর। এ
আরও পড়ুন: কোটচাঁদপুরে নানা আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত
নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে আন্দোলন হচ্ছে, সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু বাস্তব অর্থে কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না। বিশেষ করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাগ্যেরও কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং সেই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তিনি বলেন, আদিবাসীদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে পাহাড়ের মানুষের কথা শুনতে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের পথে এগিয়ে আসতে হবে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন,, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যা। অথচ দীর্ঘদিনেও এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি কার্যক্রম শুরু করলে পাহাড়ের বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, আমরা যখন ভারতে অবস্থান করছিলাম, তখন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর আদিবাসী জুম্ম শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশে ফিরে আসার পর আমরা সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বরং নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে দেখেছি। এ পর্যন্ত জুম্ম জনগণ ডজনেরও বেশি গণহত্যার শিকার হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর অতিবাহিত হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পাহাড়ের জনগণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
সভাপতির বক্তব্য জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা এবং এর সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। স্বাধীনতার পর জুম্ম জনগণের অধিকার অস্বীকার করে সামরিকায়নের মাধ্যমে দমন-পীড়নের ফলে দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। এ সংঘাতে সামরিক-বেসামরিক বহু মানুষ হতাহত ও পাহাড়ের বহু নিরীহ মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ২৯ বছর পরও এর মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি করেন
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে রাজনৈতিক উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়।
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে;
২. পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করতে হবে;
৪. চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ প্রদানের জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করতে হবে;
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে;
৬. বিধিমালা প্রণয়ণসহ দ্রুততম সময়ে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে হবে;
৭. অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন করতে হবে;
৮. পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যাসহ সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।





