আবারও শুরু হচ্ছে মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:২৬ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে দেশের নদ-নদী ও সমুদ্র এলাকায় আবারও শুরু হচ্ছে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাত থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।

সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে গভীর সমুদ্র থেকে তীরে ফিরতে শুরু করেছেন জেলেরা। এরই মধ্যে পটুয়াখালীর অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর-আলিপুর, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় হাজারো জেলে নদ-নদীতে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার পর আবারও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভা

জেলেদের দাবি, এখনও ইলিশের পেটে পর্যাপ্ত ডিম আসেনি। ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন জেলেরা।

একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময়ে বঙ্গোপসাগরে পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশের জলসীমায় নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের মধ্যে দ্রুত ও সঠিকভাবে প্রণোদনা বিতরণ এবং এর পরিমাণ বাড়ানোর দাবিও রয়েছে।

আরও পড়ুন: উলিপুরে নাটির খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক, ৭ শিক্ষার্থী

এদিকে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে চলছে শেষ সময়ের বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো সরগরম হয়ে উঠেছে।

কুয়াকাটা আশার আলো জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নিজাম শেখ বলেন, সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে বেশিরভাগ জেলেই শূন্য হাতে তীরে ফিরছেন। আগের মতো সমুদ্রে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। দেশি-বিদেশি ট্রলিং বোটের পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের আধিপত্যও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে বারবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেলে আ. রহিম বলেন, ‘এমনিতেই সাগরে মাছ পাচ্ছি না, তার ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা। সরকারি আইন মানতেই হবে। তবে সরকার যে প্রণোদনা দেয়, তা সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না এবং চাহিদার তুলনায় এর পরিমাণও অনেক কম। জেলেদের যে চাল দেওয়া হয়, তা সময়মতো ও আরও বেশি পরিমাণে দেওয়ার দাবি জানাই।’

ট্রলারের মাঝি মো. সোলায়মান বলেন, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংকের ঋণের পাশাপাশি দাদনের বোঝাও রয়েছে জেলেদের ওপর। এসব ঋণের চাপের কারণে জেলে ও মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাই হতাশায় রয়েছেন।

মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে সাগরে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে যখন কিছুটা মাছ পাওয়া যায়, তখনই আবার আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এ সময়ের সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ ধরে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার সমিতির নেতা আ. জলিল ঘরামি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রতি সম্মান রেখে জেলেরা বুধবার মধ্যরাতের আগেই সমুদ্র থেকে তীরে ফিরে আসবেন। এরই মধ্যে অনেক ট্রলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে নোঙর করেছে। অনেকে বাড়িও ফিরে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর ইলিশের আকাল গেছে। কিছু কিছু জেলে ট্রলার মাঝে মধ্যে মাছ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

জেলেরা জানান, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে একের পর এক দুর্যোগের কারণে তারা ঠিকমতো সমুদ্রে যেতে পারেননি। সেই নিষেধাজ্ঞার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় জেলে ও আড়তদারদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। ধারদেনা করে চলা এসব মানুষ এখন নতুন করে আর্থিক সংকটের আশঙ্কায় রয়েছেন।

চলতি বর্ষা মৌসুমেও নানা দুর্যোগের মুখে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। সমুদ্রে মাছ কম থাকায় জেলে ও আড়তদারদের ধারদেনা করে সংসার ও ব্যবসা চালাতে হয়েছে। এরপরও সরকারের আইন মেনে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।

কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, মা ইলিশসহ সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে। সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর সুফল শেষ পর্যন্ত মৎস্যজীবীরাই পাবেন।

তিনি জানান, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন কলাপাড়া উপজেলার ১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলেকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদেরও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।

মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত বা বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।