গাজীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহে হরিলুট: তথ্য গোপন, কৃষকদের হয়রানি ও সাংবাদিকের ওপর ডিসি ফুড কার্যালয়ে নগ্ন হামলা

Shahrier Islam Pallab
নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৩:৩৫ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:০৯ পূর্বাহ্ন, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গাজীপুর জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন খাদ্য গুদামে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও তথ্য গোপনের মহোৎসবের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকের সুবিধার্থে সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যে ধান কেনার নিয়ম থাকলেও, মাঠপর্যায়ে সাধারণ কৃষকদের ফিরিয়ে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করছেন একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। এই দুর্নীতির অকাট্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি ফুড) কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন রাজধানী টেলিভিশনের অনুসন্ধানী দল ‘ক্রাইম অ্যালার্ট’-এর সাংবাদিক । এই ঘটনায় গাজীপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে চরম সমন্বয়হীনতা ও হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। কালিয়াকৈর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গিয়ে এলএসডি (LSD) কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করলেও ধান সংগ্রহের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বা সদুত্তর দিতে পারেননি। অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায়। কালীগঞ্জে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মুঠোফোনে দায় ঠেলে দেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ওপর। কাপাসিয়ার এলএসডি কর্মকর্তা বদলির অজুহাত দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন: গফরগাঁওয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্র ধরা পড়েছে শ্রীপুর উপজেলায়। সেখানকার কর্মকর্তারা দাবি করেন, মাত্র ১১ জন কৃষকের কাছ থেকে একবার বলেছিলেন ৩১০০ টন পরে আবার বলেন ৩১টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। অথচ একই দপ্তরের এলএসডি কর্মকর্তা মুঠোফোনে দাবি করেন ধান সংগ্রহ হয়েছে ৩০ থেকে ৩২ টন প্লাস। অথচ শ্রীপুর উপজেলা থেকে সরকারের ধান সংগ্রহ করার কথা ছিল ১১৭০ টন, পুরো পুরো গাজীপুর জেলায় সংগ্রহ করার কথা ছিল ৫৮৬২টন, একমাত্র শ্রীপুর উপজেলা ছাড়া বাকি উপজেলায় কত টন ধান সংগ্রহ করেছে তার কোন তথ্য বা তালিকা আমাদেরকে দেয়নি, তবে শ্রীপুর উপজেলায় এই বিশাল গরমিলের পর দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সাংবাদিকদের যে তালিকা সরবরাহ করা হয়, তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে।

তালিকায় থাকা কৃষকদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা স্পষ্ট জানান, তারা সরকারের কাছে কোনো ধানই বিক্রি করেননি। একজন ব্লক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, সরকারিভাবে প্রতি মণ ধান ১৪৩৬ টাকা হারে কেনার ঘোষণা দিয়ে কৃষকদের দিনের পর দিন অফিসে এনে শুধু হয়রানি করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে কৃষকরা কম মূল্যে বাইরে ১০০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ কাগজে-কলমে ভুয়া কৃষকদের নাম দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ লোপাট করা হয়েছে। এই বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: হরিরামপুরে হারুকান্দি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন

উপজেলা পর্যায়ের এই নজিরবিহীন দুর্নীতি ও কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য নিতে রাজধানী টেলিভিশনের ‘ক্রাইম অ্যালার্ট’ টিমের প্রধান  গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) আফজালুল আলমের কার্যালয়ে যান। কিন্তু তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার বদলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উপস্থিতিতেই তাঁর পাশে থাকা সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সোহেল ও তাঁর সহযোগীরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তারা সন্ত্রাসীদের মতো সাংবাদিকদের জোরপূর্বক অফিসে আটকে রেখে হেনস্তা করেন। পকেট থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং ব্যাগ থেকে আরেকটি আইফোন (iPhone) ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ধস্তাধস্তিতে সাংবাদিকদের সাথে থাকা ইনফিনিক্স (Infinix) মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্তব্যরত সাংবাদিকদের অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে রেখে হুমকি দেওয়া হয় যে, এই সংবাদ টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে সম্প্রচার করলে তাদের খুন করে লাশ গুম করে ফেলা হবে।

সরকারি দপ্তরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর এমন নগ্ন হামলা ও তথ্য গোপনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। এই ঘটনায় গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গাজীপুর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং: ১৮৪৮) দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গাজীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, সরকারের কৃষকবান্ধব নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যারা সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে এবং সত্য ঢাকতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে, তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।