প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০৫ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৩ পূর্বাহ্ন, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তাঁকে ডেকে এ নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগের দিন শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় দল ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: যুব সচিব ও এসডি সচিব পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল

শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করছেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।

ভিডিওর একটি অংশে প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীদের কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াতে দেখা যায়। তাঁদের একজনকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। এ সময় কয়েকজনকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অনুনয় করতে শোনা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে।

আরও পড়ুন: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী

ঘটনাস্থলে ইশরাকের নিয়োগ দেওয়া দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও ছিলেন। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে এভাবে অভিযানে অংশ নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের মতে, প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নামার কারণে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।

শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি। কোথাও কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়সীমাও বেঁধে দেন।

প্রধানমন্ত্রীর এসব পরিদর্শনের দিনই বিকেলে ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার ঘটনা ঘটে। দল ও সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতে, এতে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনার পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা সরকারের সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে।

ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

সমালোচনার মুখে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, অভিযানের আগে মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে বলে তিনি জানতে পারেন। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন।

সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।

ইশরাক আরও দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং আত্মরক্ষার জন্যই সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে চার-পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি; পরে তাঁরা এ বিষয়ে জানতে পারেন। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন।

ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার আগে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে পড়ার পর পদত্যাগ করেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে দল ও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। যদিও হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মিষ্টি।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।

মিষ্টির পদত্যাগের প্রায় আড়াই সপ্তাহের মধ্যে এবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের জেরে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এল।