আমের শহর কেন রাজশাহী, স্বাদে গুণে দেশ সেরা
দেশের মানুষরা যখন “আমের জেলা বা শহর" সম্পর্কে কথা বলে, তখন তারা সাধারণত রাজশাহীকে উল্লেখ করে। পদ্মা নদীর তীরে উত্তর-পূর্ব তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত রাজশাহী জেলা। এই জেলার মুঘল সময়ের অনেক ইতিহাস থাকলেও আম চাষের জন্য দেশ ও বিদেশে পরিচিতি তৈরি করেছে। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসালো ফল উৎপাদনে এই উত্তরবঙ্গের মধ্যে রাজশাহী অঞ্চল পরিচিতি পেয়েছে।
একসময় মুঘল সম্রাটদের বড় বাণিজ্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল এই রাজশাহী তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। যার প্রমাণস্বরূপ মুঘলের নিদর্শনগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে। তৎকালীন সময়ে ভারত থেকে বিভিন্ন আমের জাতের বাগান তৈরি শুরু হয় এই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তবে স্বাদে গুণে এবং প্রকারভেদে জনপ্রিয়তার কারণে প্রায়শই “রাজশাহী জেলাকে আমের রাজধানী” বলা হয়, বিশেষত তার শতাব্দী-পুরোনো বাগানগুলোর জন্য পরিচিত, যেগুলো দেশের সবচেয়ে মূল্যবান আমের জাতগুলোর কিছু উৎপাদন করে চলেছে।
আরও পড়ুন: গ্রামীণ হাট-বাজারের কথা
এই জেলাকে কেন আমের শহর বলা হয়?
দেশের খ্যাতি ভৌগোলিক, জলবায়ু এবং ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে এই অঞ্চলটি পদ্মা নদী দ্বারা গঠিত উর্বর পলল সমভূমিতে অবস্থিত। উষ্ণ এবং আর্দ্র জলবায়ুর সাথে মিলিত পুষ্টিতে সমৃদ্ধ এই মাটি আম চাষের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করে। অনেক নতুন আম উৎপাদনকারী অঞ্চলের বিপরীতে, আমের সাথে এই জেলার সম্পর্ক ঐতিহাসিক।
আরও পড়ুন: বৈশ্বিক সংঘাতের ছায়ায় বাংলাদেশ
দেশের উত্তরবঙ্গের “রাজশাহী আমের শহর” বলা হয়, যেখানে ঐতিহাসিক বাগানে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, লক্ষণভোগ, বারি-৪, ব্যানানা, গোপালভোগ, ফজলি, আশ্বিনীসহ বিভিন্ন প্রিমিয়াম জাতের আম উৎপাদিত হয়। এই আম গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের আমের শহর বলতে সাধারণত রাজশাহীকে বোঝানো হয়।
পদ্মার তীরে অবস্থিত রাজশাহী আম চাষের চারপাশে তার পরিচিতি তৈরি করেছে, এটিকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি করে তুলেছে। প্রায়শই জনপ্রিয় ব্যবহারে “আমের রাজধানী” বলা হয় রাজশাহীকে, বিশেষত তার শতাব্দী-পুরোনো বাগানগুলোর জন্য, যেগুলো দেশের সবচেয়ে মূল্যবান আমের জাতগুলোর কিছু উৎপাদন করে চলেছে।
অনেক নতুন আম উৎপাদনকারী অঞ্চলের বিপরীতে, আমের সাথে মালদহের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। এখানে আমের চাষ শত শত বছর আগের, এবং বাগানগুলো স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক পরিবারের কাছে আম চাষ শুধু কৃষি নয়, এটি জীবিকা।
রাজশাহীর বিখ্যাত আমের জাত
রাজশাহী বেশ কিছু প্রিমিয়াম এবং ঐতিহ্যবাহী আমের জাত উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, যার মধ্যে অনেকগুলো দেশ ও রপ্তানি বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।
হিমসাগর (খিরশাপাতি) – এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত আমের জাতগুলোর মধ্যে একটি। হিমসাগর তার সমৃদ্ধ, আঁশবিহীন সজ্জার জন্য জনপ্রিয়। এতে মিষ্টি সুবাস রয়েছে এবং স্বাদে গুণে অনন্য। এটি দেশের সেরা টেবিল আমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
গোপালভোগ – এই আমটি খিরশাপাত আমের বিকল্প বলা যায়। স্বাদে, মিষ্টতা ও সুবাসে এর অবস্থান অন্যদের তুলনায় অনেক উপরে। গোপালভোগ আমের জন্য দেশ ও বিদেশে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা।
ল্যাংড়া – মূলত দেশের প্রায় সব জেলায় জন্মানো এই আম টক-মিষ্টি স্বাদের। এটি শক্তিশালী সুগন্ধ, সরস সজ্জা এবং স্বতন্ত্র সবুজ ত্বকের জন্য পরিচিত।
ফজলি – এই আম একটি সংকর জাতের এবং আকারে অত্যন্ত বড়। এটি দেরিতে পাকে (মৌসুমের শেষের দিকে বাজারে আসে)। কম আঁশযুক্ত হলেও হালকা মিষ্টি স্বাদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর ওজন সাধারণত আধা কেজি থেকে ৩-৪ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
লক্ষ্মণভোগ – এই অঞ্চলের আরেকটি মূল্যবান জাত। পাকা হলে এটি খুব মিষ্টি এবং সুগন্ধযুক্ত, পাল্পের গভীর সোনালি রঙের জন্য পরিচিত। এর উচ্চ বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে এবং এটি রপ্তানিযোগ্য।
অন্যান্য স্থানীয় জাত
বিশ্ববাজারের পাশাপাশি স্থানীয় বাজার ও মৌসুমি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন হাইব্রিড ও ঐতিহ্যবাহী জাত উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরশাপাত, আম্রপালি, বারি-৩, বারি-৪, ব্যানানা, হাড়িভাঙ্গা, তোতাপরি, গৌড়মতি, দুধশর ও কাটিমন।
এই অঞ্চলে প্রায় সব ধরনের আমের ফলন হলেও স্বাদ ও গুণে বেশি জনপ্রিয় রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আম। এই দুই উপজেলার খিরশা ও গোপালভোগ আম খুবই রসালো ও মিষ্টি। তবে এই দুই জাতের আমের ফলন কম এবং বাজারমূল্যও বেশি।
হাজার হাজার হেক্টর জমি আম বাগানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং জেলাটি একটি বড় মৌসুমি বাণিজ্য নেটওয়ার্ককে সমর্থন করে। কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, এবারের মৌসুমে রাজশাহীতে ১৯,১৮৮ হেক্টরে ২ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। নওগাঁ জেলায় ৩০,৩১০ হেক্টর জমিতে ৫,২১,৬১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। নাটোরে ৫,৬৯৩ হেক্টরে ৭৫,০৬০ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এই মৌসুমে ৩৭,৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন।
উপরন্তু, আম সংগ্রহ ও বিতরণ উল্লেখযোগ্য গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। গ্রীষ্ম মৌসুমে স্থানীয় বাজারগুলো অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলটি দেশের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া নাটোর, পাবনা, রংপুর, সাতক্ষীরাসহ অন্যান্য জেলায় বিভিন্ন জাতের আম চাষাবাদ শুরু হয়েছে।





