৪০৫ জনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ
নারী আসনের নির্বাচন কেবল দলীয় ভারসাম্য রক্ষায়
★জামায়াত-এনসিপির জন্য নির্দিষ্ট ১৩ ফরমেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট
★চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের শেষ প্রান্তে বিএনপি
আরও পড়ুন: গাবতলী মাঠ দখলমুক্ত করা হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
★নীরব স্বতন্ত্র এমপিরা
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও বাস্তবতা বলছে—এই নির্বাচন কার্যত ফলাফল নির্ধারিত এক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। রোববার বেলা ১২টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে মোট ৪০৫ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থী ফরম সংগ্রহ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে মাত্র তিনটি, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে।
আরও পড়ুন: সচিব পদমর্যাদায় তিন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
ইসি সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিক ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) মিলিয়ে নির্দিষ্টভাবে ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া খেলাফত মজলিস থেকে একজন এবং বাকি অধিকাংশ ফরম নিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক চিত্রই ইঙ্গিত করছে—জামায়াত-এনসিপির ওই ১৩ জনই শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। বিএনপি পাবে ৩৬ টি নারী সংরক্ষিত আসন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ৬ জন স্বতন্ত্র এমপি জোট পাচ্ছে একটি আসন।
প্রত্যাশীদের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা:
সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন সংগ্রহকারী কয়েকজন নারী নেত্রী রোববার এসি থেকে সংগ্রহ করার সময় বাংলাবাজার পত্রিকাকে তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন । শেরপুর-২ আসন থেকে থেংসি তিসা সাংমা বলেন, দলীয় সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার পর তিনি ইতিবাচক আশ্বাস পেয়েছেন এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে আশাবাদী।
অন্যদিকে জামালপুর-৪ থেকে সাদিয়া হক বাংলাবাজার পত্রিকাকে রোববার বলেন, দলীয় সাক্ষাৎকারে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স দেখিয়েছি। তিনি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সংবিধানিক কাঠামো ও বাস্তবতা:
জাতীয় সংসদের ৩০০ সাধারণ আসনের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলগুলোর মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়।এতে বিজয়ী ছয়জন এমপি প্রার্থী একটি সংরক্ষিত নারী আসন পায়। এতে ভোট দেন কেবল নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
ফলে যেসব দল নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন নিশ্চিত করে, তারা সাধারণত সেই সংখ্যার সমপরিমাণ প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। এতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়: মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণই বলে দিচ্ছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন কার্যত ফলাফল নির্ধারিত একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন আবারও দেখাচ্ছে—সংখ্যার রাজনীতি ও দলীয় কৌশলই এখানে প্রধান নিয়ামক। প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া যতই প্রতিযোগিতামূলক হোক না কেন, চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হচ্ছে দলীয় সিদ্ধান্তের ভেতরেই।
বিএনপির বাছাই শেষ পর্যায়ে:
সংরক্ষিত নারী আসনে বড় অংশ পাওয়ার সম্ভাবনায় থাকা বিএনপি ইতোমধ্যে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াকে শেষ ধাপে নিয়ে এসেছে। গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার শেষে এখন চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন চলছে।
দলীয় সূত্র বলছে, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই দল মনোনয়ন জমা দেবে।
স্বতন্ত্রদের নীরবতা: এদিকে, প্রায় ৬ টি সাধারণ আসনে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোট এখনো সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেনি। তারা পাবে একটি আসন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্রদের এই নীরবতা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও একপেশে করে তুলছে।
তফসিলই দিচ্ছে স্পষ্ট বার্তা:
ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী—
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়: ২১ এপ্রিল
যাচাই-বাছাই: ২২-২৩ এপ্রিল
আপিল: ২৭-২৮ এপ্রিল
প্রার্থিতা প্রত্যাহার: ২৯ এপ্রিল
প্রতীক বরাদ্দ: ৩০ এপ্রিল
ভোটগ্রহণ: ১২ মে
তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে—প্রার্থী চূড়ান্তকরণ ও মনোনয়ন জমার শেষ সময়েই এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার কার্যত সমাপ্তি ঘটে যাবে। কারণ, যে সংখ্যক আসন যে দল পাবে, ঠিক সেই সংখ্যক প্রার্থীই তারা মনোনয়ন দিচ্ছে।
নির্বাচন হয়নি, তবুও নির্ধারিত ফলাফল:
মূলত দেশে এখনো জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ আসনের ফলাফলের অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয় এবং ভোট দেন কেবল নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
এই কাঠামোর কারণে বাস্তবে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়—মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমাদানের চিত্রই বলে দিচ্ছে, নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করছে—সংখ্যার রাজনীতি ও দলীয় সিদ্ধান্তই এখানে মূল নিয়ামক। প্রার্থী বাছাইয়ের ভেতরেই নির্ধারিত হচ্ছে সংসদের নারী প্রতিনিধিত্বের চূড়ান্ত রূপ।
এতে প্রশ্ন উঠছে—এই ব্যবস্থায় নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, নাকি এটি কেবল দলীয় ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।





