নতুন পে-স্কেল ও কিছু পুরোনো প্রশ্ন
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ (৯ম পে স্কেল) অনুমোদিত হবার পথে রয়েছে যার ফলে প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও সামরিক সরকারি কর্মচারী এবং ৯.২৫ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী (পেনশনার, পারিবারিক পেনশন ইত্যাদি) উপকৃত হবেন। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা আগে থেকেই ছিল। কারণ, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপরও চাপ বেড়েছে। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে নতুন পে-স্কেল কি শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর সঙ্গে দেশের বড় কিছু সমস্যার সমাধানের কথাও ভাবা হবে? কারণ বাংলাদেশে সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ ইতিমধ্যেই অনেক বেশি। সীমিতসংখ্যক পদের বিপরীতে লাখ লাখ তরুণ আবেদন করেন। আসলে, সরকারি চাকরির আকর্ষণের কারণ শুধুমাত্র বেতন নয়। নিয়মিত আয়, চাকরির তুলনামূলক নিরাপত্তা, ছুটি, অবসর সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা অনেক তরুণকে এই চাকরির দিকে টানে। অনেক পরিবার এখনো সরকারি চাকরিকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অন্যতম বড় মাপকাঠি হিসেবে দেখে। এর একটি ভালো উদাহরণ ৪৭তম বিসিএস। ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৮৮টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৭ জন। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে ১০০ জনেরও বেশি আবেদনকারী ছিলেন।
তবে এত প্রতিযোগিতার পেছনে শুধু সামাজিক ও ব্যক্তিগত মানসিকতাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। এর পেছনে দেশের চাকরির বাজারের করুণ বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়-স্নাতক বেকার ছিলেন। উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া নিশ্চিত হচ্ছে না। আবার অনেক তরুণ কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকলেও তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতার তুলনায় কম বেতনের বা কম মানের কাজ করছেন। একজন তরুণ কয়েক বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পর যদি নিজের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি এমন একটি চাকরি খুঁজবেন যেখানে তার ভবিষ্যৎ তুলনামূলক নিরাপদ। তাই সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁককে শুধু তরুণদের পছন্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার মূল জায়গাটি ধরা পড়বে না। মানসম্মত চাকরির অভাব, বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও এর বড় কারণ।
আরও পড়ুন: অবক্ষয়ের ছায়ায় প্রবৃদ্ধির আলো: দ্বিমুখী বাস্তবতা
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। দীর্ঘ সময় বেতন না বাড়লে মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে যায়। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ বাড়লে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর চাপ তৈরি হয়। ন্যায্য বেতন একজন কর্মচারীকে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ মানুষকে সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করতেও ভালো বেতন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে আর একটি বাস্তবতা আছে। অনেক তরুণ বছরের পর বছর শুধু চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সময় কাটান। এতে কর্মজীবনে প্রবেশ দেরি হয় এবং পেশাগত দক্ষতা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে যায়। একটি চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে একজন তরুণ যেন তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর হারিয়ে না ফেলেন, সেদিকেও ভাবতে হবে। বিশেষ করে একজন তরুণের শিক্ষা ও দক্ষতা যদি অন্য কোনো পেশায় কাজে লাগার সুযোগ থাকে, তাহলে বছরের পর বছর শুধু একটি চাকরির আশায় অপেক্ষা করা ব্যক্তি ও দেশের দুই দিক থেকেই ক্ষতির হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে দুর্নীতি কমানোর সম্পর্ক আছে কি না, সেটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে একটু সতর্ক থাকা দরকার। শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে একজন কর্মচারীর বৈধ আয় যদি তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে আর্থিক চাপজনিত দুর্নীতির একটি কারণ কমতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি শুধু কম বেতনের কারণে হয় না। ব্যক্তিগত লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়মের সুযোগ এবং অপরাধ করেও পার পাওয়ার সম্ভাবনাও এর সঙ্গে জড়িত। তাই ভালো বেতন দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি করলে ধরা পড়তে হবে এবং শাস্তি হবে এটাও নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: বয়স্ক ভাতা: প্রবীণদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে?
এ কারণে পে-স্কেলের সঙ্গে শুধু সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্যের প্রশ্ন নয় সেই সাথে তাঁর দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত। সরকারি কর্মচারীদের বেতন আসে জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে। তাই বেতন বাড়লে জনগণেরও উন্নত, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। রাষ্ট্র কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন ও মর্যাদা দেবে, আর কর্মচারীরা নাগরিকদের দ্রুত, সৎ ও দায়িত্বশীল সেবা দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়নেও শুধু অফিসে উপস্থিতি বা চাকরির বয়স দেখা যথেষ্ট নয়। একজন নাগরিক পাসপোর্ট, ভূমি, কর, লাইসেন্স, স্বাস্থ্য বা সামাজিক নিরাপত্তার সেবা পেতে কত সময় নিচ্ছেন, কতবার অফিসে যেতে হচ্ছে কিংবা কত অভিযোগ জমা পড়ছে এসব বিষয়ও সরকারি সেবার মান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ভালো সরকারি সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্নের সমাধানও জরুরি যে, কেন দেশের এত তরুণকে সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে হচ্ছে? সরকারি চাকরির ওপর চাপ কমাতে হলে দেশের অন্য চাকরিগুলোকেও আকর্ষণীয় করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর একজন তরুণ যেন শুধু বিসিএস বা অন্য সরকারি চাকরির পরীক্ষাকেই ভবিষ্যতের পথ মনে না করেন এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় বাস্তব দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যোগাযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা বাড়াতে হবে। ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ ও বাস্তবভিত্তিক কাজের সুযোগও বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক কাজের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ইলেকট্রনিকস, নির্মাণ, পরিবহন, প্রবীণ পরিচর্যা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে দক্ষ মানুষের চাহিদা রয়েছে। এসব পেশায় ভালো আয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের জন্য সরকারি চাকরির বাইরেও অনেক পথ খুলে যাবে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতকে আরও নিরাপদ করতে হবে। সময়মতো বেতন, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা, ওভারটাইমের পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যায়ভাবে চাকরি হারালে প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের তরুণদের সামনে সফলতার একটিমাত্র পথ রাখা যাবে না। সরকারি চাকরি যেমন সম্মানজনক ও নিরাপদ হবে, তেমনি বেসরকারি চাকরি, কারিগরি পেশা, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্যোক্তা হওয়ার পথও হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ।
মোঃ মাহির ফয়সাল। সহকারী অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





