দেশ ও জাতি গঠনে শক্তিশালী অংশীদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার রক্ষার মূল শক্তি হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীকে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান আমাদের এই সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নাম ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মূলত এই বাহিনীর ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলেও অস্থায়ী সরকারের নির্দেশনার আলোকে একটি আনুষ্ঠানিক সেনাবাহিনী গঠনের আলোচনা হয় ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল তৎকালীন রণাঙ্গণের সিপাহসালার কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে সিলেট জেলায়। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত বাহিনী এবং ছাত্রজনতা নিয়ে গঠন করা হয় গণবাহিনী। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষের দিকে নিয়মিত বাহিনীকে অধিকতর শক্তিশালী ও আক্রমনাত্মক করে গড়ে তোলার জন্য গঠন করা হয় তিনটি ব্রিগেড তথা জেড, কে এবং এস ফোর্স। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন এটাই ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অংশ হয়ে গৌরবোজ্জ্বল যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতা লাভের শুরুতেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অখন্ডতা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনূভূত হয়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শক্তিশালী সেনাবাহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী পূণর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন নতুন ইউনিট ও বিভিন্ন কোর গঠনের সূদুর প্রসারি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে কুমিল্লায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি বর্তমানে যা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে অবস্থিত। মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের মাটিতে সেনা অফিসারদের মিলিটারি প্রশিক্ষণ প্রদানের গোড়াপত্তন হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি পেশাদার, দেশপ্রেমিক ও চৌকষ বাহিনী হিসেবে পরিগনিত। “সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে” এই মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে প্রতিটি সেনাসদস্য দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় শপথ নিয়ে দেশ মাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করছে। দেশের অখন্ডতা রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে দেশ ও জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে আমাদের প্রিয় দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী। দেশের সংকটকালীন সময় ছাড়াও অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘ মেয়াদি কাঠামোগত উন্নয়নসহ জাতি গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল কর্মপদ্ধতি, কারিগরি দক্ষতা, উন্নত পেশাদারিত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠা দেশের সড়ক, ফ্লাইওভার ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে চ্যালেঞ্জিং ও প্রতিকুল পরিবেশে অবকাঠামো নির্মাণে সেনাবাহিনী দেশের মানুষের ভরসার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড় কেটে সড়ক নির্মান একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পরিপূর্ণ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। থানচি-আলীকদম সড়ক দেশের উচ্চতম সড়ক যা পাহাড়ি পর্যটন শিল্প বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মিত এই সড়ক যেমন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়ে আধুনিকতার পরশ এনে দিয়েছে তেমনি পাহাড়ে উৎপাদিত পন্য সমূহ দ্রুত সমতলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় ১০৩৬ কি.মি দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ কাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম এলাকায় বসবাসরত অধিবাসীদের জীবনমানে ব্যাপক গতিশীলতা আনয়নসহ জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। পৃষ্ঠা নং-১ রাজধানীর যানজট নিরসনকল্পে গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে হাতিরঝিল প্রকল্প, মিরপুর-বিমানবন্দর ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প এবং পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পগুলো সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে। হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে এটি একটি দূষিত ও পরিত্যক্ত জলাশয় হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে হাতিরঝিল একটি নান্দনিক বিনোদন কেন্দ্র ছাড়াও ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কাজে বেশ গতিবেগ এনে দিয়েছে। প্রতিদিন শতশত মানুষ এর নান্দনিকতা দর্শনে হাজির হয়। ঢাকার মিরপুর হতে বিমান বন্দরে গমণাগমনে মিরপুর-বিমানবন্দর ফ্লাইওভার জনজীবনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে। বনানীর ওভার পাস নির্মাণে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এর নান্দনিকতাও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। ৩০০ ফিট সড়ক দেশের অন্যতম প্রশস্ত ও নান্দনিক এক্সপ্রেসওয়ে যা রাজধানী ঢাকা ও পূর্বাচলের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ নিশ্চিত করেছে। এমন নিঁখুত ও উন্নত সড়ক ও ব্যবস্থাপনা কেবল উন্নত বিশ্বে দৃশ্যমান। এছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের প্রথম মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়। বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু ‘‘পদ্মা বহুমূখী সেতু’’ দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। এই সেতু প্রকল্পের সংযোগ সড়ক এবং জাজিরা-মাওয়া প্রান্তের নদী শাসন প্রকল্প সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। এই প্রকল্পের কাজের মান ও নান্দনিকতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এই সেতুর সার্বিক তত্ত্বাবধায়কের কাজেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এভাবে জনকল্যাণে নিবেদিত হয়ে প্রতিকূল ভৌগলিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উন্নতমানের সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করে প্রান্তিক জনগনের বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে উঠছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদন্ড। এই মেরুদন্ডকে শক্ত করে তুলতে সেনাবাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কারিগরী ও উচ্চ শিক্ষা বিস্তার, দূর্গম এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার মত কাজগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী করে আসছে হাসিমুখে ও দক্ষতার সাথে। বাংলাদেশে বিদ্যমান মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্যাডেট কলেজসমূহ অন্যতম। শুধু ক্যাডেট কলেজ সমূহের বিস্ময়কর সাফল্যই নয় বরং সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ সমূহ জাতীয় পর্যায়ে ফলাফলের দিক বরাবরই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে আসছে। কঠোর শৃঙ্খলা, উন্নত পাঠদান পদ্ধতি এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আদর্শ নাগরিক তৈরিতে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি এর মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত ৫টি আর্মি মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল শিক্ষার মান উন্নয়নে আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এ্যডমিনিস্ট্রেশন, আর্মি পরিচালিত বিভিন্ন ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলো দক্ষ জনবল ও আদর্শ নাগরিক তৈরির কাজে নিয়োজিত। সমতল ভূমিতে শিক্ষা প্রসারে অসামান্য ভূমিকার বাইরে সেনাবাহিনীর অন্যতম অবদান দূর্গম পার্বত্য এলাকায় মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং দেশব্যাপী বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয় বরং এই সব দুর্গম এলাকার গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, পোষাক সরবরাহসহ উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। প্রয়াস একটি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে অটিজম ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সম্পন্ন শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও থেরাপি সেবা প্রদান করা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে এর মূল ক্যাম্পাস হলেও দেশব্যাপী বিভিন্ন সেনানিবাসে এর শাখা রয়েছে। এই মহৎ উদ্যোগের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সমাজে পিছিয়ে পড়া তথা সামাজিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত বিশেষ শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে এনে জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে অবদান রাখা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ করে দিচ্ছে। পৃষ্ঠা নং-২ ভৌগলিক অবস্থার কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে একটি দূর্যোগপ্রবণ দেশ। দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দূর্যোগকালীন উদ্ধারকার্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের টানে সর্বাগ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বন্যা, জলোচ্ছাস, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধ্বস প্রভৃতি দূর্যোগে দেশের জনগনের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। এমন জরুরী মুহুর্তে সেনাবাহিনী নিজস্ব আধুনিক সরঞ্জামাদি নিয়ে দূর্যোগ আক্রান্ত এলাকায় মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছে যায়। নিখোঁজদের খোঁজ পেতে এবং আটকে পড়াদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনতে জীবন বাজি রেখে কাজ করে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত প্রতিটি সেনাসদস্য। ত্রাণ বিতরণ ও পূর্নবাসন প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর সততা ও শৃংঙ্খলা জনগনের কাছে প্রশংসিত হয়েছে বহুবার। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা’র সময় দেশের জনগন উপকূলীয় এলাকায় সেনাবাহিনীর উদ্ধারকাজ, মৃতদেহ সৎকার এবং অস্থায়ী চিকিৎসা স্থাপনে ভয়হীন উপস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রিমেলের আক্রমণকালীন সময়ে উপকুলীয় এলাকায় বাঁধ সংস্কার ও আটকে পড়া জনগোষ্ঠিকে উদ্ধারে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল সেনাবাহিনী। ২০২২ সালের সুনামগঞ্জের বন্যার সময়, ২০১৭ সালের রাঙ্গামাটি পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় আমরা মানবিক, জনবান্ধব এবং অকুতভয় এক সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষ করি। ২০১৯ সালের বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ এর সময় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ, স্যানিটাইজেশন এবং টিকাদান কর্মসূচীসহ আক্রান্তদের সেবাদান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সেনাবাহিনী দেশের জনগনের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্দ্বিধায় রাস্তায় নেমে এসেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে একটি পরিচিত নাম। বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বেশ কয়েকটি সেনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সেনা কর্মকর্তাগণ প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে আগমণ করেন। ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। এছাড়াও বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি ব্রান্ড। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অন্তভূর্ ক্তির সাথে সাথেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে ইরাক-ইরান সীমান্ত এলাকায় ১৫ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ইউ এন শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। এরপর হাইতি, কঙ্গো, মালি, দক্ষিণ সুদান, লাইবেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকান রিপাবলিক, সিয়েরা লিওন প্রভৃতি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সেনা সদস্যরা তাদের পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ, কঠোর পরিশ্রম, শৃংখলাবোধ এবং সেই দেশের সামাজিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয়দের মন জয় করতে সক্ষম হয়। ২০০৬ সালে বিবিসি তাদের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষীদের প্রাণ ভোমরা হিসেবে উল্লেখ করে, যা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করে। শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জন করছে না বরং ব্যবসায়িক ও কুটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে প্রশংসনীয় অবদান রাখছে। গৃহ যুদ্ধ বিধ্বস্ত অনেক দেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জনপ্রিয়তা অনেক। কোন কোন দেশ তাদের রাস্তা ও শহরের নাম রাখছে বাংলাদেশকে স্মরণ করে (লাইবেরিয়া) আবার কেউ (সিয়েরা লিওন) তাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভূক্ত করে নিচ্ছে। দেশ হিসেবে এটা একটা বড় অর্জন যা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মূল সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সেনাবাহিনীর রয়েছে নিজস্ব বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও পর্যটন স্থাপনা। সেনাবাহিনী পরিচালিত ট্রাস্ট ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি ও শিল্পখাতে বিভিন্ন উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। নীলগিরি, সাজেক বা রাঙ্গামাটির মত এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। সেনাকল্যাণ সংস্থার নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বিপুল সংখ্যক শিল্প কারখানা দেশের মানুষের কর্মসংস্থানে সহায়ক ভূমিকা পালনের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রেখে চলছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করে দেশের সেনাসদস্যরা যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে তা দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পৃষ্ঠা নং-৩ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পবিত্র দায়িত্ব হলো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতে¦র নিশ্চয়তা বিধান করা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিঃসন্দেহে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে সুচারুভাবে। তদুপরি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার ও দূর্যোগকালীন সময়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকালে আমরা আমাদের পেশাদার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি একটি মানবিক সেনাবাহিনীর চিত্র দেখতে পাই। এসব কাজের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনী দেশের উন্নয়ন ও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শক্তিশালী পদচিহ্ন একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে নিঃসন্দেহে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আর এভাবেই আমাদের সেনাবাহিনী দেশের মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় অমলিন হয়ে থাকবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের শক্তিশালী অংশীদার হয়ে।





