কবিতা ও প্রকাশ

Shahrier Islam Pallab
মো. তাহিদুল হক
প্রকাশিত: ৫:৪৮ অপরাহ্ন, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৪ অপরাহ্ন, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কবিতায় সবচেয়ে দুরূহতম কাজটি বোধ হয় প্রকাশ করা। যা প্রকাশ করতে যাচ্ছি  তা ক'টি শব্দ প্রয়োগে বাঞ্ছিত সাড়া দিল না; তাই চেষ্টা করছি কতটা প্রকাশক্ষম আমার নির্বাচন। ভেবে চিন্তে যা স্থির করলাম তা হয়তো ইঙ্গিত দিল মাত্র, সম্পূর্ণটা দিতে পারল না। এই অক্ষমতার ভেতরেই আমার লক্ষ্য স্থির ও নম্র, আমার শূন্যস্থানটি পাঠক ভেবে নিক তার মত করে, তার চিন্তায়, নিজস্ব আবেগে। একটি শব্দ হতে পারে একটি সীমাবদ্ধতা, হতে পারে সীমাহীন একটি ভাবনা। তাই সে শব্দটিই বেছে নিব যা আমার প্রকাশকে অসীম করে তুলবে।

রবীন্দ্রনাথও অসীমের কথা বলতেন, বলতেন প্রকাশই কবিতা। প্রকৃতির বিস্মায়াবিষ্ট ভাবুকের সংকোচ মনকে তিনিও তিরস্কার করতেন; শুধু রবি ঠাকুর নন, যে জীবনানন্দ সমকালে মিতবাক অসামাজিক (!) বলে বিতর্কিত তিনিও প্রকাশ ভালোবাসতেন বলেই আধুনিক বাংলা কবিতার এই অকল্পনীয় ঐশ্বর্য। যিনি কবি তিনি মানুষ বটে, তবে ঐশ্বরিক প্রতিভাও তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই আচ্ছন্নতা প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ক্রিয়াশীল সুপ্তিতে আবিষ্ট; কেউ সাধনায় তার সাক্ষাৎ পান বলেই সাধারণের চক্রে তাকে বাঁধা যায় না, তিনি হয়ে ওঠেন হোমার বা বাল্মীকি।

আরও পড়ুন: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন: ক্ষমতার পালাবদল নয়, গণতন্ত্রের জবাবদিহির পরীক্ষা

সন্দেহ নেই জন্ম-তিথি মেনে কবিতা আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির হয় না, জন্মদানের পূর্ব মুহূর্তে উত্তেজিত কবি প্রসব বেদনাও অনুভব করেন না, কিন্তু কবিতা জলোচ্ছ্বাসের মত নির্দ্বিধায় প্রবল বেগেও উপস্থিত হয় না, একটি কার্যকারণ সূত্রেই করির অবচেতন প্রাঙ্গন কবিতার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। এই প্রস্তুতি তার সত্তায় ও শিরায় সঙ্গোপন সম্মোহন তৈরি করে, যে কারণে কবিতাও নীরব প্রশস্তির মত তার সুপ্তির আবরণ ভেঙে স্বকণ্ঠে প্রকাশ্য হয়।

সকল প্রকাশে কবির প্রতিভার পরিচয় থাকে না, কোন কোন প্রকাশ নেহাৎই না বলা কথায় পর্যবসিত হয়, শিল্পের সঙ্গতি বোঝে না। প্রকাশ কে না চায়! স্রষ্টা তো বটেই, বিশ্বসংসারও প্রকাশ চায়, তার প্রতিটি বস্তু-অতিবস্তু অণু বা পরমাণুর অতিসূক্ষ্মতাও প্রকাশ চায়, সুন্দর-অসুন্দর দুই'ই প্রকাশ চায়, কুৎসিতও সুন্দর হয় প্রকাশের সৌন্দর্যে, আপাত অশ্লীলতাও শিল্পের গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে ওঠে শুধু এই গুণটির জন্য।

আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য

অনেকক্ষেত্রে অশ্লীল শব্দও অনিবার্য হয়ে ওঠে। একজন কবি আজীবনই অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন না, তার এমনও প্রতিভা তৈরি হতে পারে, অন্য লেখকের লেখায় যা অশ্লীল তার লেখায় তা'ই নান্দনিক গুণসমৃদ্ধ। কবির উচিৎ হবে শ্লীল-অশ্লীল ভেদাভেদকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যে শব্দটির অভাব তিনি অনুভব করেন সে শব্দটিকেই গ্রহণ করা। এ জন্য কবির স্বাধীন সত্তার প্রয়োজন। আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যও কবিকে মার্জিত শ্রেণি লালনের ইঙ্গিত দিতে পারে, তবে প্রত্যেক কবির জন্যই নিজস্ব ভাষাভঙ্গি অপরিহার্য। ভাষাভঙ্গি কবির স্বকীয়তার মাপকাঠি বিশেষ। ভাষাভঙ্গি বা শব্দ নির্বাচন ও প্রয়োগ- সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে মহৎ পর্যায় পর্যন্ত একজন কবিকে পৌঁছতে দেয় না। একজন নবীন কবির পেছনে তার পূর্ববর্তী কবির পথ তৈরি থাকে চিহ্নিত সংকেতের মত। নব্য কবি আসক্ত হয়ে পড়েন পূর্ববর্তীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে, কারণ প্রস্তুতকৃত পথটি তার ইতোমধ্যেই আয়ত্তে আসতে শুরু করে দেয়। কিন্তু সৃজনশীল রচনায় কবির অবশ্যই দায়িত্ব ও কর্তব্য হবে পূর্ববর্তীদের শাব্দিক সংসর্গ ত্যাগ করা। তাকে বেছে বেছে শব্দ নির্বাচন করতে হবে। ত্যাগ করতে হবে চর্চিত জনপ্রিয় ও অন্য কবি কর্তৃক সৃষ্ট চলমান শব্দ সম্ভার ও প্রায়োগিক উদ্দেশ্য। স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা আনতে তাই বিশ্বাস ও আদর্শের পাশাপাশি শব্দকেই প্রথম বিবেচনায় রাখতে হবে। আর কবিতার ক্ষেত্রে এই নির্বাচনটাই প্রধান সমস্যা।

নান্দনিক বিবেচনায় শব্দের নির্বাচন প্রক্রিয়া কবির স্বাধীনতার দাবি রাখে। কারণ কবি বুঝতে পারেন তার কবিতায় সঙ্গত শব্দটির আবির্ভাব ও প্রয়োগ। নির্বাচনটি অবশ্যই বিষয়ীর প্রতিনিধিত্ব ও একই সঙ্গে প্রকাশ-ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তি রূপে গণ্য হয়। এ জন্য ব্যক্তিগত styleও জরুরী।

এজরা পাউন্ড শব্দ নির্বাচনের ওপর কবির দক্ষতার কথা স্বীকার করে গেছেন, 'গৎবাঁধা শব্দাবলি থেকে আপনি স্পষ্ট কোন ধারণা পাবেন না, কারণ পঁচিশ জন লোক একটি শব্দকে পঁচিশভাবে ব্যবহার করেন। আমার কাছে এটাই হলো প্রথম যুদ্ধ।' ('লেখকের কথা' ২০০৩ : ৪৫) কোনটি কবির পক্ষে অনিবার্য তা ভেবে দেখার প্রয়োজনে প্রত্যেক কবিই তার স্বপক্ষের মানসিক যুক্তির কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। অপরিণত কৌশলের কাছে কোন শিল্পেরই পূর্ণ বিকাশ ঘটে না- এ সত্য জানার পরও ভবিষ্যতের কোন এক রঙিন-সম্ভাবনার দিকে ছুটে চলে কবির আন্তরিক পদক্ষেপ। তাই চর্চা ও প্রতিভার কথা স্মরণ করে গেছেন বহু মনীষী ও কবি। এ দুয়ের সংযোগ প্রত্যেক মহৎ কবির জন্যই আশির্বাদ। পাউন্ড শিল্পের গৎবাঁধা সংশ্রবকে সচেতনভাবে এড়ানোর পক্ষপাতি ছিলেন, ফলে তিনিও বহু সাধনায় একটি স্বকীয় জগৎ তৈরি করে গেছেন 'একজন কবির ধারাবাহিক ঔৎসুক্য থাকা প্রয়োজন। এতে অবশ্য তিনি কবি বনে যাবেন না। তবে এর অভাবে তিনি শুকিয়ে ঝরে পড়বেন ।' (লেখকের কথা, ২০০৩ : ৩৬) পাউন্ডের এই কথার মাধ্যমে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি মেধাকে ঐশ্বরিক ভাবলেও তার ব্যাবহারিক  অভাববোধকে পরিত্যাগের বিষয় বলে মনে করেন।

আমাদের কবিদের জীবনে দৈনন্দিন বহু ঘটনায় ঐহিক ও পারত্রিক নির্বাণ ঘটে, বহু বহু সংকটের উৎক্রান্তি আমরা লক্ষ করি, সাফল্যের সম্ভাবনায় স্থির করি বিশেষ উদযাপন। যাপিত এই জীবনের অর্থপূর্ণ বা অর্থরহিত যে কোন ঘটনাতেই ব্যক্তিগত মন্থন ব্যতীত কবির নৈরাশ্য ঘোঁচে না, কবি প্রকাশ না করা অবধি একাকিত্বে ভোগেন, ভীষণ লক্ষ্মীছাড়া মনে করেন কবিসত্তাকে, অমার্জনীয় ক্ষোভে আত্মনাশের বৃন্তে ফোটান প্রাণজ কুসুম। চর্চা তো নিজের বিষয়। একবার ফ্রস্ট কৌতুক ছলে বলেছিলেন, 'বিড়ালের চামড়া ছিলার একাধিক পদ্ধতি আছে। কিন্তু আমি জানি না কী করে তা করতে হয়।' (লেখকের কথা ২০০৩ : ৩১) ফ্রস্টের রসিকতা স্বীকার করেও বলা যায় অন্তর্গত শূন্যতা থেকেই কবিতার জন্ম, রবীন্দ্রনাথ বলেন তাগিদ, 'ভেতরের একটা তাগিদ' যা আপনা থেকেই কবিকে ঘোর লাগা বর্ষণের মত আচ্ছন্ন করে রাখে। এর মধ্যেই কেউ কেউ কবি অডেন বা সুধীন্দ্রনাথের মত সচেতন শব্দকৌশলী হয়ে উঠতে পারেন, যারা ঘোষণা দিয়েই শব্দ নিয়ে খেলা করার কথা বলতে আনন্দ পান। সুধীন দত্ত তো রীতিমতো অপ্রচলিত ও কঠিন শব্দ প্রয়োগের দুর্বোধ্যতার দোষ চাপালেন পাঠকের আন্তরিক পড়াশুনার অভাবের ওপর। কিন্তু এতে করে কি কাব্যের প্রসাদগুণ লোকোত্তরিত হলো? ক'জন সুধীন বাবুর কবিতা পড়েন?

কবিতা অধরা বলেই না প্রকাশের এত রূপ, এত রীতি। শৌখিনত্বের কাছে প্রাচীন কবিরা হার মেনেছিলেন, এখনকার কবিরা শৌখিন নন এ কথা বলা যাবে না। তবে শৌখিনতা ও অনিবার্য এক জিনিস নয়, এক পক্ষ স্বপ্নাতুর, অপরটি স্বপ্নভঙ্গের কারণও বটে। কবিতা যেমন শৌখিন, তেমনি অনিবার্য- অন্তত আজ-কাল তা'ই আধুনিকদের আরাধ্য। ওয়ার্থসওয়ার্থ আঠারো শতকের শেষে (১৭৯৮) তার Lyrical Ballads-এ কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর জোর দিয়েছিলেন। রোমান্টিক এই  প্রবাদ পুরুষের 'স্বতঃস্ফূর্ততা' আধুনিকভাবে স্বীকার করেছিলেন বিশ শতকের ডাডাবাদ থেকে সুররিয়ালিজম পর্যন্ত ভাবুক কবিগোষ্ঠি, যারা অর্থবিচ্যুতিরও ভয় করতেন না। তারা জোর দিয়েছিলেন অবচেতনের প্রশ্রয়ের ওপর। এই প্রশ্রয়টিই উত্তর-আধুনিক কালের প্রধান কাব্যশক্তি, আলঙ্কারিক গুণ। হেনরি মিলার শব্দের এক ধরনের শক্তির কথা বলতেন যা প্রতিটি শব্দ পরম্পরার ভেতর অবিচ্ছিন্ন গতি নিয়ে আসে, একটি শব্দ আরেকটি শব্দের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে; মিলার এই অংশ-বিশেষকে বলেছেন 'ক্যাডেনজা।' ক্যাডেনজা বা স্বতঃস্ফূর্ততা যা'ই বলি না কেন কবিতার পুরোভাগেই কবির কর্ষণশক্তির যোগ্যতা ও আয়ত্তের সামর্থ ব্যতীত কোন প্রতিক্রিয়াই মূল পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। শিল্পের ধর্মই তো ফোটার গৌরবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার 'ফেয়ার অয়েল টু আর্মস'- এর শেষ পৃষ্ঠা উনচল্লিশবার পুনর্লিখন করে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। শিল্পের সঙ্গে এই আত্মীক ধৈর্যও শিল্পীর প্রত্যাশার সৌধকে স্পর্শ করতে যথেষ্ট।

তবে একটি কবিতার আংশিক প্রকাশ কবির জন্য তার পরবর্তী কবিতার ক্ষেত্রে অপসৃত প্রেরণা বলে গণ্য হতে পারে, এতে অভিজ্ঞতার ক্ষতি হয় না, কবিতা তো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই নির্যাস। প্রকাশই যদি শব্দে, গন্ধে, স্পর্শে তবে তো অভিধানের নির্দিষ্ট অর্থের অতিরিক্ত কিছুকেই কবিরা মরিয়া হয়ে খুঁজছেন, অন্তত প্রাচীন ধ্বনিবাদী থেকে  রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিককাল পর্যন্ত এই বাচ্যার্থের অতিরিক্ত গুণকেই ধরার জন্য আগ্রহের শেষ নেই, এ জন্যই শব্দের সঙ্গে কবির হয়ে গেছে সঙ্গোপন বসবাস। পঞ্চেন্দ্রিয়ের ব্যাকরণিক প্রথার বিরুদ্ধেই না আধুনিক করিরা তাই খড়গহস্ত।

প্রতিরোধের সাহিত্যেও এই বিশেষ গুণটি প্রধান অস্ত্র বলে বিবেচ্য। প্রতীক, রূপক, সংকেতের বহুবিধ ব্যবহারে যথার্থই বাংলা কাব্যাঙ্গন এই রীতি-বৈচিত্র‍্যের কাছে ঋণী। কবিতা বা সমগ্র সাহিত্যে প্রকাশবাদ বহু প্রাচীন ধারণা। প্রত্যেক যুগেই নতুন করে উন্মোচিত হয় কবিতার রহস্য। প্রাচীন আলঙ্কারিক বামন বলেছিলেন রীতি বা style ই কবিতার নিত্যগুণ, আর সব কিছুই অনিত্য। অবশ্য আধুনিককালে কোন কিছুই, কোন তত্ত্বই দীর্ঘজীবী হয়নি, তাই রীতি বা styleও পাল্টেছে ঢের বেশি। যে রীতিই কবি-ঋষিরা আনুন না কেন তার প্রকাশ হওয়া চাই মনের খোরক মিটিয়েই। আসলে কবিতা তার গতিপথ পরিবর্তনে প্রত্যেক যুগেই পেয়ে গেছে মহামুনি কবি-ঋষিদের।

কাব্যলক্ষ্মীর প্রত্যাদিষ্ট মেধা ও প্রতিভার সঙ্গে কবিরা মিশ্রন ঘটিয়েছেন লৌকিক আধিপত্যের। তাই আধুনিককালের কাব্যাঙ্গনও জনে-বিজনে, স্বাদে-বিস্বাদে কবি থেকে কবিতে গন্তব্যের পসরা নিয়ে অস্থিতিশীল সময় পার করছে। তার শরীরে ভাঙনের নতুন সুর, পরিবর্তনের সস্নেহ চিহ্ন সে লালন করছে নিজের ভেতর, আমরা অপেক্ষায় আছি আরো একটি শতাব্দীর পরিণত যৌবনে পদার্পণের ঔৎসুক্য নিয়ে।

মো. তাহিদুল হক 
প্রভাষক, বাংলা বিভাগ 
সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা