তানজিন তিশা ও সামিয়া অথৈর সদস্য পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলো অভিনয়শিল্পী সংঘ
শুটিং সেটে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অভিনেত্রী তানজিন তিশা ও সামিয়া অথৈর মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধের রেশ কাটেনি। বরং কয়েক মাস ধরে চলা এই দ্বন্দ্ব এবার গড়িয়েছ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে। সমঝোতার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা না হওয়ায় তিশা ও অথৈর সদস্যপদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ।
গত ৪ অক্টোবর দুই অভিনেত্রীর কাছে পাঠানো পৃথক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় সংগঠনটি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৭ জুলাই তানজিন নাহার তিশা ও সামিয়া আক্তার অথৈকে সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের কেউই সংগঠনের কার্যালয়ে লিখিত জবাব জমা দেননি।
আরও পড়ুন: বরের পরিচয় আড়াল করতে পারশার অভিনব কৌশল
এ ছাড়া দুই শিল্পীর মধ্যকার বিরোধ নিয়ে অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশের সালিস বা বিবাদ মীমাংসাকরণ কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিষদের নিয়মিত সভায় তাঁদের সদস্যপদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা মিঠু।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কের পর এবার ফ্লোরিডার মঞ্চে গাইবেন অপূর্ব
এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু জানান, শিল্পীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনে অভিনয়শিল্পী সংঘের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সালিস কমিটি রয়েছে। শুরু থেকেই দুই অভিনেত্রীর মধ্যে ভুল–বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল সংগঠনটি।
তিনি বলেন, ঘটনার পর দুই শিল্পীর সঙ্গে একাধিকবার বসে তাঁদের বক্তব্য শোনা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় দুজনকেই সালিস বৈঠকে ডাকা হয়। সেখানে তাঁদের ক্ষমা চেয়ে একটি বিবৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ভিডিও বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ভিডিওটি প্রকাশ করা হবে কি না, সেটি সংগঠনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয় ছিল।
তবে সালিস কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্তের কোনোটিই বাস্তবায়ন করেননি দুই অভিনেত্রী। তাঁদের কাছে পরপর দুটি চিঠি পাঠানো হলেও কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানান রাশেদ মামুন অপু। এমনকি চিঠিগুলো ফেরত আসে। পরে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।
এ অবস্থায় দীর্ঘ বিরতির পর সালিস কমিটি তাঁদের সদস্যপদ বাতিলের সুপারিশ করে। পরবর্তী সময়ে কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সদস্যপদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তানজিন তিশা ও সামিয়া অথৈর মধ্যকার বিরোধের সূত্রপাত গত ৩ মার্চ। মানিকগঞ্জে পরিচালক রাফাত মজুমদারের একটি নাটকের শুটিং চলাকালে দুই অভিনেত্রীর মধ্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে তিশার বিরুদ্ধে মারধর ও অপদস্থ করার অভিযোগ করেন সামিয়া অথৈ।
অথৈর দাবি ছিল, নাটকের একটি দৃশ্যে তাঁকে তানজিন তিশাকে হালকাভাবে চড় মারতে বলা হয়েছিল। পরিচালকের নির্দেশনা মেনেই তিনি অভিনয় করেন। কিন্তু দৃশ্যটি ধারণের সময় তিশা তাঁকে কয়েকবার জোরে চড় মারেন। এতে তাঁর চোখ ও গাল ফুলে যায় এবং কথা বলতেও অসুবিধা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনার পাশাপাশি তিশার সঙ্গে আগে থেকেই ব্যক্তিগত বিরোধ থাকার কথাও জানিয়েছিলেন অথৈ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তানজিন তিশা। তাঁর বক্তব্য ছিল, শুটিংয়ে যা ঘটেছে, তা নাটকের চিত্রনাট্য ও চরিত্রের প্রয়োজনে। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ বা আক্রোশ থেকে তিনি সামিয়াকে আঘাত করেননি।
তিশা জানান, নাটকটিতে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করছেন। চরিত্রটির আচরণের অংশ হিসেবে অন্যকে আঘাত করা কিংবা কামড় দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। তাই চিত্রনাট্যের নির্দেশনা অনুসারেই দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল। নাটকটি প্রচারিত হলে দর্শক পুরো বিষয়টি বুঝতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে নাটকটির পরিচালক রাফাত মজুমদারও নিজের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট দৃশ্যে দুই অভিনেত্রীরই পরস্পরকে চড় মারার কথা ছিল। অভিনয়ের সময় কোনো চড় তুলনামূলক জোরে লেগে যাওয়ার কারণে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।শুটিংয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই অভিনেত্রীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে অবস্থান জানায় অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সদস্যের সঙ্গে পেশাগত বিরোধ, মতপার্থক্য কিংবা জটিলতা তৈরি হলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে প্রকাশ না করে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে অবহিত করা উচিত। এ ধরনের আচরণ সংগঠনের নির্ধারিত আচরণবিধির পরিপন্থী।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো ঘটনার একপক্ষের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুরো অভিনয়শিল্পী সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পেশাগত বিরোধ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয় সংগঠনটি। পাশাপাশি আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
এরপর থেকেই দুই অভিনেত্রীর বিরোধ নিরসনে কয়েক দফায় আলোচনার উদ্যোগ নেয় অভিনয়শিল্পী সংঘ। তাঁদের বক্তব্য শোনা, সালিস বৈঠক আয়োজন এবং সমঝোতার চেষ্টা—সবকিছুই করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক।
তবে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিস্থিতির সমাধান হয়নি। কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়া এবং সালিস কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সদস্যপদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় কার্যনির্বাহী পরিষদ।
উল্লেখ্য যে, দুই অভিনেত্রীর সদস্যপদ স্থগিতের চিঠিতে শুটিং সেটে মারধরের অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সংগঠনের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নোটিশের জবাব না দেওয়া, সালিস কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করা এবং সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।





