হাম-ডেঙ্গুতে ১,০৬০ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ জনের প্রাণহানি

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:০৬ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:০৬ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ কোলাজ
ছবিঃ কোলাজ

দেশে একদিকে হামের উপসর্গে একের পর এক শিশুর মৃত্যু, অন্যদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ—দুই সংক্রামক রোগে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৫১৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুতে আরও তিনজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৭ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬৮ জন মারা গেছেন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের। অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৯৩ জন। অর্থাৎ দুই রোগে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০ জনে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত, মৃত্যু ৩

তবে সামগ্রিক মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এবং বিশেষ করে শিশুদের প্রাণহানি। গত ২৪ ঘণ্টায়ই চার শিশুর মৃত্যু সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হামের উপসর্গে ৮৬৮ মৃত্যু: 

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে আরও ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৯৪

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬৮ জনে। নিশ্চিত হামে মারা গেছেন আরও ৯৯ জন। সব মিলিয়ে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৬৭।

এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে—৩৮৮ জন। এরপর সিলেট বিভাগে ১৪৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ৯২ জন, ময়মনসিংহে ৭৪ জন, চট্টগ্রামে ৬৪ জন, বরিশালে ৫৩ জন, খুলনায় ৩৪ জন এবং রংপুরে ১৪ জন মারা গেছেন।

অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৫১৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৯ জনে।

একই সময়ে ৩৬৫ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুমৃত্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ: 

হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে চার শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে সামনে এসেছে। কারণ, একদিকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে শিশুদের ঝুঁকি এবং মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতার দাবি রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ফলে হামের উপসর্গ নিয়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া এবং শত শত মৃত্যুর পেছনে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, টিকাদান, মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কোথাও ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান ও জবাবদিহি জরুরি: 

হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৬৮ জনের মৃত্যু এবং নিশ্চিত হামে আরও ৯৯ জনের মৃত্যু—এই পরিসংখ্যানকে কেবল নিয়মিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশুদের ধারাবাহিক মৃত্যু পরিস্থিতির গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত হামে মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় মৃতদের রোগনির্ণয়, চিকিৎসা পাওয়া, হাসপাতালে নেওয়ার সময়, মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন বয়সী ও কোন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর শিকার হচ্ছে, তাও বিশ্লেষণ করা দরকার।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ওপর রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। তাই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন জরুরি।

ডেঙ্গুতেও ২৪ ঘণ্টায় ৩ মৃত্যু: 

হামের ভয়াবহতার পাশাপাশি ডেঙ্গুও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন তিনজন।

নতুন রোগীদের নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৬৮৩ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী।

জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারাদেশে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৩২ জন মারা গেছেন।

রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৪০২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এক দিনের ব্যবধানে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৭ জনে পৌঁছেছে।

একই সঙ্গে দুই রোগের চাপ: 

হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগেই নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে দুই রোগের মধ্যে হামের উপসর্গে ৮৬৮ জনের মৃত্যু এবং গত ২৪ ঘণ্টায় চার শিশুর প্রাণহানি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ।

হাম প্রতিরোধে টিকাদান, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও পৃথকীকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নগর এলাকায় কার্যকর নজরদারি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন: 

একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগে ১ হাজার ৬০ জনের মৃত্যু এবং প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষ করে হামের উপসর্গে বিপুলসংখ্যক মৃত্যু এবং শিশুদের সাম্প্রতিক প্রাণহানি পরিস্থিতিকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হামে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা পর্যালোচনা করে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়, আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, টিকাদান কার্যক্রমের আওতা ও কার্যকারিতা এবং মাঠপর্যায়ের রোগ নজরদারির বাস্তব চিত্র প্রকাশ করা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

জনস্বাস্থ্য সংকটে শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়—মৃত্যু কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ, সেই পদক্ষেপের ফলাফল এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।