সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন হাব লালদিয়া, নির্মাণে বিনিয়োগ হচ্ছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার

Sanchoy Biswas
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৮:২৭ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:২৭ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন হাব উন্মোচিত হলো কর্ণফুলী নদীর মোহনা-সংলগ্ন ৪৯ দশমিক ১৫ একর আয়তনের ছোট্ট একটি চরে। যার নাম লালদিয়া। সেখানে নির্মিত হচ্ছে কনটেইনার টার্মিনাল। বিনিয়োগ হচ্ছে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বছরে হ্যান্ডলিং হবে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কনটেইনার। এতে বদলে যাবে দেশের অর্থনীতির চিত্র।

আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে প্রধান অতিথি হিসেবে এই টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। এ ছাড়া চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, শাহজাহান চৌধুরী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানসহ এপিএম টার্মিনালস ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল শুধু দেশের জন্য নয়, বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের আধুনিক বন্দর অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবার কমল স্বর্ণের দাম

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্প একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে বিশ্বের সেরা লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান, আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামো, উন্নত বন্দর ও আধুনিক শহর প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে লালদিয়া টার্মিনালের মতো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বন্দর ও বাণিজ্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই বাণিজ্য খাতকে ঘিরে পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অনেকাংশে বন্দরের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিতব্য এ টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্ত হবে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

আরও পড়ুন: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় সুখবর

সূত্রমতে, কনটেইনার টার্মিনালের মূল অংশটি নির্মিত হবে চরের ৩২ একর জায়গায়। এর সঙ্গে ৭ দশমিক ১৫ একর কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে গড়ে উঠবে পুরো টার্মিনাল। প্রকল্পটি নির্মাণে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। জমির মালিকানা থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে। নির্মাণ শেষে ২০৩০ সাল থেকে পরবর্তী ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ ও যথাযথভাবে পালন করা হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ বছর পর্যন্ত টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। এই টার্মিনালে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটির মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হবে। এর বার্ষিক সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার)। প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সক্ষমতা ও প্রযুক্তি। প্রকাশিত নকশা অনুযায়ী লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টাইয়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজি) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর। টার্মিনালটি ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। এখানেই লালদিয়া টার্মিনালের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন রয়েছে বলে মন্তব্য করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আকারের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় কনটেইনার জাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না। এপিএম টার্মিনালসের লালদিয়া টার্মিনালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউএস জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা বিদ্যমান সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়। ফলে ফিডার নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও শিপিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হবে। পুরো প্রকল্পটি বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত ও পরিচালিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেশে আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও এ প্রকল্প থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবে বলে সূত্র জানায়, প্রথম ৮ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ মার্কিন ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত ২৩ ডলার করে পাবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর এককালীন ২৫০ কোটি টাকা প্রদান করা হবে। তবে প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তির সব শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বিনিয়োগ প্রকল্প বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এপিএম টার্মিনালসের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছিলেন, টার্মিনালটি হবে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন টার্মিনাল। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বিশ্বের একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প করছে, এটি দেশের জন্য গৌরবের। লালদিয়া প্রকল্পকে তিনি বাংলাদেশের জন্য গেম চেঞ্জার হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন অপারেটরের সেবার মান ও ব্যয়ের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরাই ভালো সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। চেম্বার পরিচালকমণ্ডলী ও সর্বস্তরের ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষে শনিবার রাতে এপিএম টার্মিনালসের চেয়ারম্যান রবার্ট মার্সক উগ্লাকে প্রেরিত এক পত্রে চেম্বার সভাপতি বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ বিশ্বদরবারে একটি নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করবে। এই প্রকল্পের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল একটি টার্মিনাল নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটরের উপস্থিতি বাংলাদেশে আরও বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে জানান চেম্বার সভাপতি। চট্টগ্রামের কৌশলগত ভৌগোলিক সুবিধার কারণে রিজিওনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড লজিস্টিক হাব হওয়ার বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চেম্বার সভাপতি এ.পি. মোলার-মার্সক ও এপিএম টার্মিনালসকে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশে আরও বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্প, বিশেষ করে বে টার্মিনাল, জাহাজ নির্মাণ ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, একটি বিশ্বখ্যাত টার্মিনাল অপারেটরের সরাসরি বিনিয়োগ বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগের আস্থা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনায় প্রতিযোগিতা তৈরি হলে সেবার মান, সময় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানিকারকেরা সুবিধা পেতে পারেন। ব্যবসায়ী নেতা খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা কম সময়ে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ভালো সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাঁর মতে, লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা ও ব্যয়-প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাও প্রকল্পটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। এপিএম টার্মিনালস তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দক্ষ কনটেইনার বন্দরের ১০টিতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। লালদিয়াকে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক, কম কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী টার্মিনালের একটি প্রদর্শনী প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। বন্দর সচিব বলেন, শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইনে। পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য কিংবা হালকা প্রকৌশল রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। বড় জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভেড়ার সুযোগ এবং দ্রুত কনটেইনার ওঠানামা করা গেলে পণ্য পরিবহনে অপেক্ষার সময় কমতে পারে। সরকারি পিপিপি কর্তৃপক্ষও প্রকল্পটির অন্যতম সুবিধা হিসেবে দ্রুততর জাহাজ পরিচালনা, ডুয়েল টাইম কমানো এবং লজিস্টিক ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে। লালদিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নির্মাণ, ট্রাকিং, গুদামজাতকরণ, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ও সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায় কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে লালদিয়া চরে চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। লালদিয়া চর থেকে গুপ্তবাঁক পার হলেই পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), যা পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)। এর আরও ৭ থেকে ৯ কিলোমিটার উজানে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। আর লালদিয়া হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের ৬তম কনটেইনার টার্মিনাল। বন্দর ব্যবহারকারীদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ টার্মিনাল দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্ণফুলীর মোহনায় জেগে ওঠা একটি চর লালদিয়া, যা একসময় ছিল অবৈধ দখলে। চরটি দখলমুক্ত করে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের হাব হয়ে উঠল সেই লালদিয়া। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরে ২০২৩ সালের ২১ মে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি জয়েন্ট প্ল্যাটফর্মের সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে ডেনমার্ক সরকারের পক্ষে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালস এবং স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর এ প্রকল্পে টার্মিনালটি নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।