মিসর, লেবানন ও জর্ডানের মুসলিম ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করল যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র মিসর, লেবানন ও জর্ডানে কার্যরত মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের বিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কঠোর অবস্থান নেওয়ার অংশ হিসেবেই ওয়াশিংটন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা । এর কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে মুসলিম ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: গাজায় ধসে পড়া ভবন ও তীব্র শীতে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জর্ডান ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন’ (SDGT) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লেবাননের সংগঠনটিকে আরও কঠোর শ্রেণিভুক্তি—‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (FTO) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব সংগঠন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখা প্রকাশ্যে নিজেদের বৈধ নাগরিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরলেও গোপনে তারা হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে।
আরও পড়ুন: ‘ইরানে বিক্ষোভে প্রাণহানির জন্য ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দায়ী’
এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নেতা সালাহ আবদেল হক। আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখো মুসলমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সংগঠনটি আইনি পথে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবে।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চাপের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড কখনো সন্ত্রাসে জড়িত ছিল না বা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ কিংবা সহায়তা দেয়নি।
মার্কিন ঘোষণার ফলে এসব সংগঠনকে আর্থিক বা বস্তুগত সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অবৈধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এবং এফটিও তালিকাভুক্ত সংগঠনের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
মুসলিম ব্রাদারহুডের পটভূমি
১৯২৮ সালে মিসরের ইসলামি চিন্তাবিদ হাসান আল-বান্নার হাত ধরে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর শাখা, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে। সংগঠনটি দাবি করে, তারা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিশ্বাসী।
লেবাননে মুসলিম ব্রাদারহুডের শাখা আল-জামা আল-ইসলামিয়া দেশটির পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। জর্ডানে তাদের রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩১টি আসন জয় করেছিল। তবে জর্ডান সরকার পরে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করে, নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ২০১২ সালের একমাত্র গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলেও এক বছর পর সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়। সংগঠনটির নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ২০১৯ সালে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকে মিসর সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করে ব্যাপক দমন অভিযান চালিয়ে আসছে।
মঙ্গলবার মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই ডানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী মুসলিম অভিবাসী ও ইসরায়েল-সমালোচকদের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান নেতাদের অনেকেই আগে থেকেই সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এ ঘোষণার পর টেক্সাস ও ফ্লোরিডার রিপাবলিকান গভর্নররা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)-কেও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসী’ তালিকাভুক্ত করেছেন। তবে সংগঠনটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।





