ইরানের ওপর মার্কিন চাপ, স্পষ্ট হচ্ছে চীনের সমর্থন

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন। ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বেইজিংয়ের রয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তবে ওয়াশিংটনের নতুন করে চাপ বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রতি চীনের সমর্থনেরও যে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সামরিক হামলা ও নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে বেইজিং। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক চীনের বৈদেশিক নীতির অনেকগুলো হিসাবের একটি মাত্র অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যেকোনো মূল্যে ইরানের নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ বেইজিংয়ের নেই।

আরও পড়ুন: নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে ২ শ্রমিক উদ্ধার

চীনের শাওশিং বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না-মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক হংদা ফান বলেন, বিশ্বজুড়ে চীনের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কমাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তবে ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও তীব্র সংঘাতে জড়াবে না চীন। তার মতে, শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানকেই নিজেদের মধ্যে এই সংঘাতের সমাধান করতে হবে।

জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন ও ইরানের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন আধিপত্য নিয়ে দুই দেশেরই সন্দেহ রয়েছে। তবে এই সম্পর্ক পুরোপুরি সমান নয়। চীনের তুলনায় ইরানই বেইজিংয়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দিতে ইরানের নতুন কৌশল

সম্পর্কের এই অসম চিত্র সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বার্ষিক সম্মেলনেও ফুটে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে বিবেচিত ১০ সদস্যের এই জোটের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক ডজনের বেশি অ-পশ্চিমা দেশের নেতা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও।

কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ফাঁকে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের একটি ‘সংক্ষিপ্ত বৈঠক’ হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে চীনের গণমাধ্যমে ওই বৈঠকের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর মঙ্গলবার এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মিসর সফরে যান শি। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ‘বহিরাগত হস্তক্ষেপের’ বিরোধিতা করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর দেশটির মোট তেল রপ্তানির সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কিনেছে চীন। তবে চীনের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহারে ইরানের অপরিশোধিত তেলের অংশ মাত্র প্রায় ২ শতাংশ।

চীনের তেল কেনা ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে চীনা আমদানিকারকরাও পুরোপুরি মুক্ত নয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বড় তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ও পেট্রোচায়না বহু বছর ধরেই ইরানি তেল কেনা থেকে দূরে রয়েছে। ফলে এই বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালনা করছে ছোট ও স্বাধীন ‘টিপট’ শোধনাগারগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

ট্রাম্প প্রশাসন এসব ‘টিপট’ শোধনাগার এবং চীন ও হংকংভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে ইরানি তেল কেনায় সহায়তার অভিযোগ থাকা চীনের বড় ব্যাংকগুলোকে এখনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি।

‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে জোরদার করা নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীনের আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে দুই দেশ যখন বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, তখন বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে ওয়াশিংটন কতটা এগোবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বেইজিংভিত্তিক সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের (সিসিজি) উপমহাসচিব জিচেন ওয়াং প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের একতরফা অর্থনৈতিক নীতি অন্য দেশগুলো কেন মেনে চলবে?

তবে তার মতে, এর অর্থ এই নয় যে ইরানকে সীমাহীন সহায়তার নিশ্চয়তা দেবে চীন। বেইজিং রাজনৈতিকভাবে মার্কিন দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং নিজেদের বৈধ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার অবস্থান ধরে রাখতে পারে। কিন্তু অতীতের কর্মকাণ্ড দেখিয়েছে, চীনের বড় ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক।

বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক

চীন ও ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও বহু বছর ধরে দুই দেশের কথাবার্তা ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় ২৫ বছরে ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা এবং ইরানের জটিল ও অস্বচ্ছ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে চীনা কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারানোয় সেই প্রতিশ্রুতির খুব কম অংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

২০২৩ সালে ইরানের তৎকালীন উপ-অর্থমন্ত্রী আলী ফেকরি চীনের বিনিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তার হিসাবে, ওই চুক্তির পর ইরানে চীনের বিনিয়োগ মাত্র প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল।

চায়নামেড প্রজেক্টের গবেষণা প্রধান আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লি বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইরান সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না—এমন অভিযোগ প্রায়ই করেন ইরানের বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলার তেমন কোনো কারণ নেই।

তার মতে, অন্য দেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ করা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ ও বেশি লাভজনক। এর পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

এদিকে চীনের অর্থনৈতিক সহায়তার সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক—ইরানি তেল কেনা—এখন কমে আসছে। ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের প্রভাবও পড়েছে এই বাণিজ্যে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চীনের উদ্দেশে যাওয়া ইরানি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি মার্চ-এপ্রিলে দৈনিক আনুমানিক ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল থেকে আগস্টে কমে মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। তবে অবরোধের আগে পাঠানো আরও কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল এখনো সমুদ্রে রয়েছে।

সোমবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সমুদ্রে ইরানের ‘মাত্র’ প্রায় ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে এবং ইরানের কাছে চীনা অর্থপ্রবাহও শেষ হয়ে আসছে।

তবে কেপলার গত মাসে অনুমান করেছিল, সমুদ্রে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে, যা থেকে তেহরান আরও ছয় মাস পর্যন্ত রাজস্ব পেতে পারে।

ইসরায়েলের অ্যাশকেলন একাডেমিক কলেজের চীন-মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মর্দেকাই হাজিজা বলেন, চীনের কাছে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিভিন্ন দিক থেকে বিকল্পযোগ্য। ইরানি তেল গুরুত্বপূর্ণ হলেও সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও অনেক দেশ থেকে চীন জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে।

তার মতে, ইরান চীনকে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশাধিকার দেয়, কিন্তু পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই চীনের সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে চীনের বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার লক্ষ্যকে ইরান সমর্থন করলেও এ ধরনের অবস্থানে থাকা আরও অনেক দেশ রয়েছে।

ইরানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রেও চীনের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গেও বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

হাজিজার মতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের বড় জ্বালানি ও বাণিজ্যিক অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসে এই অঞ্চল থেকে।

তার ভাষায়, বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হলো এমন একটি স্থিতিশীল, সার্বভৌম, অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত এবং পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত ইরান, যার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর কোনো পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে না চীনকে।

সিসিজির জিচেন ওয়াংও মনে করেন, চীনা বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় বেইজিং দৃঢ় থাকবে। তবে এর জন্য মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের অন্য অঞ্চলে নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

তার মতে, একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে চীনের সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে ইরানের পুরো অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব বেইজিং নিতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের (ওএফএসি) সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেরি বিটসফের মতে, চীনের কাছে ইরান মূলত একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা, মিত্র নয়।

তিনি বলেন, অনেকেই চীন ও ইরানের সম্পর্ককে যে ধরনের জোট হিসেবে দেখেন, বাস্তবে তা তেমন নয়। ইরান থেকে চীনের বাস্তব সমর্থন রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কটি অনেকটা এমন একজন ক্রেতার সঙ্গে, যেখান থেকে ইরানের সরে যাওয়ার সুযোগ খুব সীমিত।

তার মতে, এই সম্পর্ক চীনের জন্যও লাভজনক—কারণ তারা কম দামে তেল পেয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যস্ত রাখতে পেরেছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত এই সম্পর্ক চীনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, ততক্ষণই এর স্থায়িত্ব থাকবে।

সূত্র: আল-জাজিরা