উপসাগরের নিরাপত্তায় শুধু মার্কিন সেনা যথেষ্ট নয়: কাতার
উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হিলি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও স্বনির্ভর হতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তি ও মিত্রদের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও নিজেদের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন: ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট
আনসারি বলেন, ‘উপসাগরে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি যথেষ্ট নয়।’
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। মিত্র ও অংশীদারদের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু শুধু তাদের ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: রাশিয়ায় তুষারধসের ঘটনায় ১১ পর্বতারোহী নিহত
কাতারে আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পাল্টা হামলার অন্যতম লক্ষ্য হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো।
আনসারির বক্তব্যের বিপরীতে সাবেক মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক এভ্রিল হেইনস সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ফেস্টিভ্যালে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
হেইনসের মতে, কোনো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর চেষ্টা করে সম্পদ ও সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হলে অনেক সময় তার ফল ভালো হয় না।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের পাল্টা হামলা যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বাড়তে থাকে, তখন হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও দূতাবাসকর্মীকে অঞ্চলটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সবাই আবার উপসাগরে ফিরবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের তাগিদ
ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন আনসারি। তিনি স্বীকার করেন, তেহরানের সঙ্গে নতুন করে আস্থা তৈরি করতে সময় লাগবে। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান করতেই হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদপত্র দ্য ন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাতার যেমন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের পথ খুঁজে নিয়েছে, তেমনি ইরানের পাশেও বসবাসের একটি উপায় বের করা সম্ভব।
তবে এ ক্ষেত্রে ইরানের ওপরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রতিবেশী দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে না দেখে ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সামরিক বা অন্য কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না—তেহরানকে তা উপলব্ধি করতে হবে বলে জানান আনসারি।
তিনি বলেন, উপযুক্ত সময় এলে কাতার ইরানের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চায়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংকটে যেমন নিজেদের রক্ষার সক্ষমতা দেখানো হয়েছে, তেমনি প্রতিরোধক্ষমতাও বজায় রাখা হবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে সংঘাত দ্রুত শেষ হবে বলে আশ্বাস দিয়ে এলেও আনসারি সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাতের অবসান হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্ব এই সংঘাত আর দীর্ঘায়িত হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকাও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সহনীয় নয়। একইভাবে উপসাগরজুড়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়াছুড়ি চলতেও পারে না।
গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তেল পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন তৈরি হলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তবে আনসারি এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তার মতে, বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমবে না।
দ্য ন্যাশনালকে তিনি বলেন, হাজার হাজার বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে হরমুজ প্রণালি। কোনো একটি পদক্ষেপ বা পরিস্থিতি এর সেই অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না।
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা
ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দেশটিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ কৌশলেরও সমালোচনা করেছেন আনসারি।
বেসেন্ট ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই কৌশলকে দেশটির অর্থনীতিকে ‘শ্বাসরোধ’ করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে আনসারির মতে, অতীতে ইরাক, লিবিয়া ও অন্যান্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
তার ভাষায়, কাতারের কাছে কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথ হলো আলোচনার টেবিল, অর্থনৈতিক চাপ নয়।





