অ্যাবি চোই হত্যার নৃশংস বর্ণনা আদালতে
হংকংয়ের মডেল ও ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাবি চোই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে আদালতে অভিযোগ তুলেছে সরকারপক্ষ। শুনানিতে হত্যার পরিকল্পনা, দেহ খণ্ডবিখণ্ড করা এবং আলামত গোপনের নানা বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার হংকংয়ের হাইকোর্টে শুরু হওয়া এ মামলায় অ্যাবির সাবেক শ্বশুর কাও কুয়াং, সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কুয়াং ও সাবেক দেবর অ্যান্থনি কুয়াং নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। বিচারপ্রক্রিয়া প্রায় আট সপ্তাহ চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নয় সদস্যের জুরিবোর্ডের সামনে প্রসিকিউশন তাদের অভিযোগ ও প্রমাণ উপস্থাপন করছে।
আরও পড়ুন: ভিসা নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের কঠোর সতর্কবার্তা
প্রসিকিউটর শার্লট ড্রেকট এসসি আদালতে জানান, হংকংয়ের হো মান তিন এলাকার কাদুড়িয়া আবাসিক এলাকায় অ্যাবি চোইয়ের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ৬ কোটি হংকং ডলারে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন অ্যাবি। ২০২২ সালে সেটি প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ হংকং ডলারে বিক্রির উদ্যোগ নেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, কাউলুন তংয়ে নিজের বাড়ির কাছাকাছি থাকলে সাবেক স্বামী অ্যালেক্সের দুই সন্তানের দেখাশোনা করতে পারবেন তাদের দাদা-দাদি।
আরও পড়ুন: ইরান ঘিরে আরও ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
একাধিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উচ্চ অঙ্কের স্ট্যাম্প ডিউটি এড়াতে ফ্ল্যাটটি সাবেক শ্বশুর কাও কুয়াংয়ের নামে নিবন্ধন করা হয়েছিল বলে আদালতে জানানো হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, পরবর্তী সময়ে সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগে কাও কুয়াংকে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেন অ্যাবি। এরপর বড় ছেলের সঙ্গে অন্য একটি ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করেন কাও কুয়াং। সরকারপক্ষের অভিযোগ, ফ্ল্যাটটি হারানোর ক্ষোভ থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে অ্যাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।
শুনানিতে অ্যাবি চোইয়ের মাকে পাঠানো কয়েকটি ব্যক্তিগত অডিও বার্তা বাজানো হয়। সেখানে সাবেক শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায় তাঁকে। সাবেক শ্বশুরকে প্রতারক বলেও উল্লেখ করেন অ্যাবি।
একটি অডিও বার্তায় তিনি বলেন, ফ্ল্যাটটির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল এবং সেটি মূলত সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই করা হয়েছিল। বিবাহবিচ্ছেদের পরও সাবেক স্বামীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের আচরণে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রসিকিউটর আদালতে বলেন, অ্যাবির পরিবার এবং তাঁর দ্বিতীয় জীবনসঙ্গী ক্রিস তামের পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল। বিপরীতে কুয়াং পরিবার ছিল তুলনামূলকভাবে অসচ্ছল। সরকারপক্ষের দাবি, এই আর্থিক বৈষম্য এবং সম্পত্তির প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিন আসামির প্রত্যেকেরই পরিকল্পনায় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন। নির্জন ফ্ল্যাট ভাড়া করা থেকে শুরু করে অ্যাবিকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও এর অন্তর্ভুক্ত বলে জানানো হয়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য, হত্যাকাণ্ডটি সম্মিলিতভাবে সংঘটিত হওয়ায় কে সরাসরি আঘাত করেছিলেন, সেটি দায় নির্ধারণের একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন ২৮ বছর বয়সী অ্যাবি চোই। তিন দিন পর হংকংয়ের তাই পো এলাকার একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে তাঁর দেহের কিছু অংশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তে ওই ফ্ল্যাট থেকে মাংস কাটার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক করাত ও রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করা হয়। একটি বড় পাত্রে সবজির সঙ্গে তাঁর মাথার খুলি পাওয়া যায়। ফ্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর বিচ্ছিন্ন দুই পা। শরীরের অন্যান্য অংশের কিছু নিখোঁজ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা অ্যালান চুংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের দেয়াল রক্তে ভেজা ঠেকাতে পলিথিন বা ত্রিপল ব্যবহার করা হয়েছিল। দেহ খণ্ডবিখণ্ড করার সময় রক্ত থেকে বাঁচতে অভিযুক্তরা ফেস শিল্ড ও রেইনকোট ব্যবহার করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে।
অ্যাবি চোই ছিলেন হংকংয়ের পরিচিত মডেল ও ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার। ১৮ বছর বয়সে অ্যালেক্স কুয়াংকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সংসারে দুটি সন্তানের জন্ম হয়। পরে বিচ্ছেদ হলেও সাবেক স্বামীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন বলে তাঁর অডিও বার্তায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় জীবনসঙ্গী ক্রিস তামের সঙ্গে তাঁর আরও দুটি সন্তান হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ফ্যাশন ফটোশুট ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আয়োজনের ছবি প্রকাশ করতেন তিনি। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও প্যারিস ফ্যাশন উইকে ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের একটি আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন অ্যাবি।
আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো চলমান। শুনানিতে প্রসিকিউশনের পরবর্তী যুক্তি উপস্থাপনের কথা রয়েছে শুক্রবার।





