‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মেরেছে’- দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ

Any Akter
বিবিসি বাংলা
প্রকাশিত: ১:২৩ অপরাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভের সময়ে আটক হওয়া একাধিক ছাত্রছাত্রী ও বিক্ষোভকারী পুলিশের বিরুদ্ধে মারধর, দুর্ব্যবহার এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন।

এদের মধ্যে কয়েকজন বিক্ষোভকারী তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছেন। তবে তারা এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আন্দোলন চলবে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে নিহত বেড়ে ৩৪

আটক হওয়া শিক্ষার্থী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, তাদের অভিজ্ঞতা শুনেছে।

বিবিসি জানায়, তাদের অভিযোগের ব্যাপারে দিল্লি পুলিশের বক্তব্যও জানতে চেয়ে কিন্তু এখনও কোনো উত্তর মেলেনি।

আরও পড়ুন: ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়-এর স্নাতকোত্তর ছাত্রী এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই)-এর সদস্য শরণ্যা শর্মাকে ১১ই অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালীন আটক করা হয়। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, পুলিশকর্মীরা তাকে ধাক্কা মেরে বাসে তুলে দেন।

মিজ. শর্মার দাবি, নারী পুলিশকর্মীরা তার পোশাক টেনে তুলছিলেন। পুরুষ কমান্ডোরা জোর করে তাকে বাসে তুলছিলেন।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ‘একজন নারী পুলিশকর্মী আমার টি-শার্ট টেনে মাথার উপরে তুলে দিয়েছিল। আমাকে অপমান করার জন্যই করেছিল।’

তার চুল টানা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এই শিক্ষার্থী। বাসে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢুকছিল না বলেও তার অভিযোগ। ওই বাসে চার-পাঁচটা ছোট খোপ করা ছিল।

তার কথায়, ‘যখন আমাকে ঠেলে ঢোকানো হচ্ছিল, আমি পুরোপুরি ভেতরে যেতে পারিনি। আমার পা তখনও বাইরে ছিল। কমান্ডোরা লোহার দরজা বন্ধ করে দেয় আর আমার পা দরজায় আটকে যায়। ভেতরে থাকা চারটে মেয়ে চিৎকার করছিল। তারা বলছিল, ওর পা আটকে গেছে।

তারা অনুরোধ করছিল, এক মিনিটের জন্য দরজাটা খুলে দিন। তাহলে ও ভেতরে ঢুকতে পারবে। কিন্তু পরের ৩০ সেকেন্ড ধরে আমার দ্বিগুণ আকারের তিনজন পুরুষ ওই দরজা জোর করে ঠেলতে থাকে।’

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আনুমানিক সকাল ১১টা নাগাদ তাকে আটক করে নাঙ্গলোইয়ের একটা আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মুক্তি দেওয়া হয় গভীর রাতে। সেখানে খাবার, পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুবিধারও অভাব ছিল বলে শরণ্যা শর্মার অভিযোগ।

এসএফআইয়ের দিল্লি সভাপতি এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ছাত্রী নাদিয়াকে ১০ই অক্টোবর বিক্ষোভের সময় আটক করা হয়েছিল। তার সঙ্গে যখন আমাদের দেখা হয়, তখন তার শরীরেও আঘাতের চিহ্ন ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি ১২ই অক্টোবর ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

নাদিয়ার অভিযোগ, আটক অবস্থায় নারী পুলিশকর্মীরা তার চুল টেনেছেন এবং চিমটি কেটেছেন। পুলিশ তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল এবং তখন বাধা দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন নাদিয়া।

তিনি বলেন, পুরো বাসে আমি ছাড়া অন্য একটা মেয়ে ছিল। এবারের আটকের ঘটনা খুবই কষ্টদায়ক ছিল। জেনেশুনে পুলিশকর্মীরা টেনে টেনে বাসে তুলছিল, চিমটি কাটছিল। পা দিয়ে মারছিল আমাদের, গলা চেপে ধরে বসানো হচ্ছিল। সেই সময়ে বাসে আমি আর অন্য মেয়েটা ছাড়া একজন পুরুষ পুলিশকর্মী আর পাঁচজন নারী পুলিশ ছিল

তার গলা টিপে ধরারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন এই শিক্ষার্থী। নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতেই এভাবে আটক করা হচ্ছে।

তার কথায়, ‘বাসে যেতে যেতে পুলিশকর্মীরা আমাদের কাছে জানতে চায় আমরা কোথায় থাকি, ক্যাজুয়ালি কথা বলছিল। আজ আর তোমরা বাড়ি ফিরতে পারবে না বলে ভয় দেখাতে থাকে। আমি ফোন বের করে রেকর্ড করতে গেলে একজন ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি এবং ফোন ফেরত নিই।’

‘তারপরের ১৫ মিনিট আমার উপর নৃশংসতা হয়েছে। অত্যাচার চালানোর মতোই ছিল সেটা। (হাতের আঘাত দেখিয়ে) এগুলো আঘাতের চিহ্ন। এগুলো মূলত টানা হেঁচড়ার সময় হয়েছে। কিন্তু তার পরেরটুকু খুবই খারাপ ছিল (অন্য হাতের কালসিটে পড়া দাগ দেখিয়ে)। মূলত চারজন পুলিশকর্মী আমার উপর চড়াও হন।’

এদের মধ্যে কেউ তাকে চিমটি কাটছিলেন, কেউ চুল ধরে টানছিলেন বলে তার অভিযোগ।

তার কথায়, ‘অন্য এক নারী পুলিশ দ্বিতীয় মেয়েটাকে শাসাচ্ছিল।’

‘আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওরা আমাকে বলছিল, তোমাকে আধমরা অবস্থায় ছাড়ব। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কত মারবে আমাকে? উত্তরে বলেছিল এখান থেকে আধমরা অবস্থায় ফিরবে তুমি।’

বিক্ষোভে সামিল অন্যান্য নারীদের হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। নাদিয়ার কথায়, ‘কারো কারো শার্ট টেনে মাথার উপর তুলে দেওয়া হয়েছে যাতে তারা অসম্মানিত বোধ করেন।’

নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতেই এভাবে আটক করা হচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে যে সমস্ত প্রশ্ন উঠছে, তা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই অংশ। জবাবদিহি না মেলা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ তারা চালিয়ে যাবেন।

দিল্লিতে পিএইচডি করছেন নোভেল। হাতে ভগৎ সিংয়ের পোস্টার নিয়ে তিনি ১০ই অক্টোবরের বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ তাকে আটক করছে এবং তার পোস্টার নিয়ে নিচ্ছে।

নোভেলের দাবি, তাকে একটা কমলা রঙের দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের বাসে বসিয়ে রাখা হয়। সেখানে তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা ছিলেন বলে জানিয়েছেন নোয়েল। সে সময় পুলিশ তাকে বারবার চড় মেরেছে বলে অভিযোগ করেছেন। তখন বাসে তিনি একাই ছিলেন এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

তার কথায়, ‘চার পাঁচজন মিলে আমাকে তাড়া করেছিল। তারা বলতে থাকে বাসে চলো কিছু হবে না। আমি প্রথমে বাধা দিইনি। আমি বাসের কাছে যেতেই কয়েকজন পুলিশ বলে ওঠে- এই ছেলেটার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে একে ধর, একে ধর। তারপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে তোলা হয়। ওই বাসটা কিন্তু পুলিশের প্রিজন ভ্যান ছিল না।’

‘এটা পুলিশের বাস ছিল, তাদের যাতায়াতের জন্য ছিল। আমাকে বাসে টেনে তোলা হয়, ধাক্কা দেওয়া হয়। আমি পড়ে যাই, আর পড়ে যেতেই তিন-চারজন পুলিশ মিলে আমাকে ক্রমাগত মারতে থাকে।’

‘ওই বাসটা কোথাও যায়নি। এক জায়গাতেই দাঁড় করানো ছিল। তিন ঘণ্টা এভাবেই চলেছে। ১০-১৫ মিনিট অন্তর এসে এসে আমাকে থাপ্পর মারছে।’

‘আমি বহুবার আটক হয়েছি কিন্তু এই প্রথমবার আমি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ ওরা বলছিল- বাসে তুমি একা আছ। কেউ জানতেও পারবে না তোমার সঙ্গে কী ঘটেছে?’ বলছিলেন তিনি।

নোভেল জানিয়েছেন, তিনি পুলিশদের অনুরোধ করেন তাকে ছেড়ে দিতে। তাদের জানান যে তিনি পিএইচডি করছেন এবং পাশাপাশি শিক্ষকতাও করছেন। তার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, এসব সত্ত্বেও মারধর চলতে থাকে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

‘প্রিজন ভ্যানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখে একজন ঘুষি মারে। আমি মাটিতে পড়ে যাই আর আমি দেখলাম ওই ভ্যানে চার-পাঁচটা খুপরি ছিল।’

‘ভ্যানে তিনজন পুলিশ এবং একজন কমান্ডো ছিল। একজন আমাকে মারধর করল তারপর অন্যজনের কাছে আমাকে ঠেলে দিল। সে আমার যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে মারে। তারপর তৃতীয় জনের কাছে আমাকে ঠেলে দেওয়া হয়। সে আমার বুকে লাথি মারে। তারপর চতুর্থজন আমার গলা টিপে ধরে। তারপর আমাকে ওই প্রিজন ভ্যানের খুপরিগুলোর মধ্যে একটাতে পাঠানো হয়। আমি বাধা দিইনি কারণ আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে।’

অর্জুন আরও অভিযোগ করেন বাসে কয়েকজন নাবালকও ছিল, যাদের মধ্যে কয়েকজনের চোট লাগে। এমনকি কারো কারো হাড়ও ভেঙে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। কিন্তু তার দাবি, পুলিশ এমনভাবে আঘাত করছিল যাতে শরীরে স্পষ্ট দাগ না থাকে।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই ভিডিও দেখিয়েছেন বিবিসিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

১০ ও ১১ই অক্টোবর বিক্ষোভ কভার করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিককেও আটক করা হয়। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনেতে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫ জনেরও বেশি দিল্লির সাংবাদিক ছিলেন।

ওই সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে 'স্ক্রল', 'বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড', 'নিউজলন্ড্রি' এবং 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি'-র সাংবাদিকরাও ছিলেন।

১০ই অক্টোবর আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন 'স্ক্রল.ইন'-এর শোয়েব দানিয়াল ও আয়ুষ তিওয়ারি, 'বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'-এর অনুষ্কা ভরদ্বাজ এবং ‘নিউজলন্ড্রি’-র অশ্বিনী কুমার সিং, আস্থা সব্যসাচী ও অনমোল প্রীতম। নিউজলন্ড্রি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের সাংবাদিকদের ফোনও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।