কসাই জিহাদকে নিয়ে লাশের কিমা উদ্ধারে নানা স্থানে তল্লাশি

দুই দেশের গোয়েন্দাদের তদন্তে খুনিরা চিহ্নিত

মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব
প্রকাশিত: ৯:০৬ অপরাহ্ন, ২৪ মে ২০২৪ | আপডেট: ৯:১৮ পূর্বাহ্ন, ২৫ মে ২০২৪
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের কলকাতায় ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের আসামিদের চিহ্নিত করেছে দুই দেশের গোয়েন্দারা। দুই দেশের গোয়েন্দাদের বৈঠকে তদন্তে তারা একমত হয়েছে যে আখতারুজ্জামান শাহিনের পরিকল্পনায় দুই দেশের চিহ্নিত অপরাধীদের নিখুত পরিকল্পনায় হত্যা ও লাশ টুকরো টুকরো করে কিমা বানিয়ে গুম করেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োগ করা হয়েছে খুলনার পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির দুর্ধর্ষ কিলার আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ও ভারতের খুবই দক্ষ কসাই জিহাদ  ওরফে সিয়াম। 

এদিকে কলকাতা সিআইডি মুম্বাই থেকে কসাই জিহাদকে আটক করে ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। তার দেওয়া তথ্য মতে লাশের কিমা উদ্ধারের জন্য তার দেখানো ফেলে দেওয়া বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কিন্তু এখনো কিছু উদ্ধার করতে পারেনি। তাকে ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে সিআইডি। এদিকে বাংলাদেশের মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি তাদের হাতে আটক হওয়া ৩ আসামী দুর্ধর্ষ কিলার শিমুল, সুন্দরী নারী সেলেনিস্কি ও ফয়সালকে আটক দেখিয়ে আদালতে হাজির করে ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ঢাকায় আসা কলকাতা সিআইডির টিম ঢাকার মহানগর গোয়েন্দা ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। মহানগর গোয়েন্দা সূত্র জানায় বৈঠকে কলকাতার সিআইডির সাথে সাথে ঢাকার গোয়েন্দাদের তদন্তে প্রায় একমত। যে এমপি আনারের বাল্যবন্ধু আখতারুজ্জামান শাহিনের পরিকল্পনায় দুই দেশের দুটি চৌকস অপরাধী চক্রের যৌথভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত করার ক্লাস গ্রহণ করেছে। এজন্যে তারা তিন মাস ধরে কিলার নিয়োগ পরিদর্শন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী তদারকি করেছে। বাছাই করেছে কলকাতার অভিজাত ফ্ল্যাটকে। এজন্য মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে দক্ষ অপরাধী চক্রকে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশিদ ভারতের সিআইডি কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের কথা স্বীকার করে বলেন, দুইদেশের তদন্ত কর্মকর্তারা খুনিদের চিহ্নিত ও পরিকল্পার বিষয়ে মোটামুটি একমত হয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারীসহ বাকী খুনিদের আটক করে লাশের টুকরো উদ্ধারের জন্য আমরা কাজ করছি। আসামিদের দেয়া তথ্য মোতাবেক কলকাতার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আসামিদের রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বিস্তারিত জানা যাবে। 

আরও পড়ুন: ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস

দুই দেশের তদন্তে এমপি আনোয়ারুল আজিমকে হত্যায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক জিহাদ হাওলাদার একইসঙ্গে হত্যার পর মরদেহ টুকরো করার কাজ করেছে। জিহাদ হাওলাদার পেশায় একজন কসাই। কলকাতার বনগাঁ থেকে গত বৃহস্পতিবার তাকে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি। গতকাল জিহাদ হাওলাদারকে ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে বারাসাতের আদালত। সাংবাদিকদের সিআইডি’র এক শীর্ষ কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জানিয়েছেন- জিহাদ হাওলাদার অবৈধভাবে ভারতের মুম্বাইতে বাস করতেন। তার আদি বাসস্থান খুলনা জেলার দিঘলিয়া থানার অন্তর্গত বারাকপুরে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক আখতারুজ্জামান দু’মাস আগে জিহাদকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল। গত বৃহস্পতিবার জিহাদকে আটক করে একটানা জেরা করা হয়। তারা নিহত আনোয়ারুল আজিমের দেহ কলকাতা সংলগ্ন কোনো এলাকায় ফেলে দিয়ে থাকতে পারে, সেটা জানার চেষ্টা করা হয়। নিহত এমপি’র দেহাংশের খোঁজে সিআইডি গত বৃহস্পতিবার রাতে কলকাতা পুলিশ এলাকার অন্তর্গত পোলেরহাট থানার কৃষ্ণবাটি সেতুর কাছে বাগজোলা খালে তল্লাশি চালায়।

নিউটাউন এলাকার যে ফ্ল্যাটে আজিমকে খুন করা হয়, সেই আবাসিক কমপ্লেক্সের সামনে দিয়েই এই খালটি বয়ে গেছে। তবে সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি বলেই সিআইডি জানিয়েছে। শুক্রবার সকালে কাপড় দিয়ে জিহাদ হাওলাদারের মুখ ঢেকে তাকে বারাসাতের আদালতে নিয়ে যায় সিআইডি। দুপুরে তার ১২ দিনের সিআইডি রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

আরও পড়ুন: ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, দায় আগের সরকারের নীতির: বাণিজ্যমন্ত্রী

বিবিসি বাংলাকে সিআইডি’র ওই শীর্ষ কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমকে খুনের পরে কীভাবে দেহ লোপাট করা হয়েছিল, তার ভয়ঙ্কর বর্ণনা দিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া জিহাদ সিআইডি’র জেরায় স্বীকার করেছেন যে আখতারুজ্জামানের নির্দেশে ওই ফ্ল্যাটে সে এবং আরও চারজন বাংলাদেশি নাগরিক এমপি আনারকে শ্বাসরোধ করে খুন করে। সিআইডি’র ওই কর্মকর্তা বলেন, হত্যা করার পরে মৃতদেহ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে শরীরে মাংস আলাদা করে নেয় তারা। শরীরের মাংস এমনভাবে টুকরো টুকরো করা হয় যাতে তাকে চেনা না যায়। মাংসের খণ্ডগুলো পলি প্যাকেটে ভরা হয়। হাড়ও ছোট টুকরো করা হয়। এরপরে ফ্ল্যাট থেকে প্যাকেটগুলো বের করে বিভিন্নভাবে কলকাতার নানা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।

কলকাতা সিআইডি সূত্রের খবর, গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করার পর জিহাদকে ভাঙড়ের একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজিমকে খুনের পর সেখানেই দেহাংশ ফেলা হয়েছে বলে জেরায় উঠে এসেছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেখান থেকে কোনো দেহাংশই মেলেনি। তাই গতকাল জিহাদকে দেহাংশ উদ্ধারের প্রয়োজনেই হেফাজতে তল্লাশি চালায় কিন্তু উদ্ধার করা যায়নি।  ফলে গ্রেপ্তারকৃতদের জেরা করে যা তথ্য মিলেছে, তার উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে তদন্তকারীদের। এক্ষেত্রে, অভিযুক্তরা কোনোভাবে তদন্তকারীদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হবে। সেই সূত্রেই জিহাদকে হেফাজতে প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর ডিবির সাথে বৈঠকে সিআইডি সূত্রের খবর, হানিট্র্যাপের শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য। শিলাস্তি রহমান নামের এক মহিলাকে সামনে রেখে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নিউটাউনের ওই আবাসনে। তারপর সেখানে তাকে খুন করা হয়। ধৃত জিহাদের বিরুদ্ধে খুনের জন্য অপহরণ, তথ্য নষ্ট করা, ভুল তথ্য দেয়া, খুন এবং অপরাধের চক্রান্ত করার ধারা যোগ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন সিআইডি জানতে পেরেছে, খুনের অন্তত দু’মাস আগে মুম্বাই থেকে কলকাতায় আনা হয়েছিল কসাই জিহাদকে। তিনি জেরার মুখে স্বীকার করেছেন, প্রথমে আজিমকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। তার পর দেহ কাটা হয় টুকরো টুকরো করে। হাড় এবং মাংস আলাদা করা হয়। চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তাতে হলুদ মাখান অভিযুক্তরা। যাতে বাইরে কেউ জিজ্ঞাস করলে বলা যায়, রান্না করার জন্য মাংস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই দেহাংশ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। আট দিন নিখোঁজ থাকার পর গত বুধবার তাঁর খুন হওয়ার বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত করে। সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া জিহাদের বয়স ২৪ বছর। তিনি মুম্বাইয়ের অবৈধ অভিবাসী। তাঁর বাবার নাম জয়নাল হাওলাদার। বাড়ি খুলনার দীঘলিয়ায়। খুলনায় খবর নিয়ে জানা গেছে, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া জিহাদ হাওলাদার সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম হত্যার ঘটনার ভাড়া করা খুনি কুখ্যাত সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়ার সহযোগী হিসেবে পরিচিত। শুক্রবার ভারতের পুলিশ এ হত্যার ঘটনায় সিয়াম নামের একজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলেছিল। তবে সিয়াম এখন কাঠমন্ডুতে বলে জানা গেছে। আসলে জিহাদ হাওলাদারকেই তাঁরা সিয়াম বলে মনে করেছিল।

কলকাতা সিআইডি বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া জিহাদ স্বীকার করেছেন, আখরুজ্জামানের নির্দেশেই তিনি এবং চার বাংলাদেশি মিলে আনোয়ারুল আজীমকে হত্যা করেন।

আনোয়ারুলকে তাঁরা প্রথমে শ্বাসরোধে খুন করেন বলে জানান জিহাদ। মৃতের পরিচয় যাতে বোঝা না যায়, তাই তাঁরা শরীরের হাড় ও মাংস আলাদা করে ফেলেন। এরপর হাড় ও মাংস টুকরা টুকরা করে কেটে সবকিছু পলিথিন ব্যাগে ভরে ফ্ল্যাটের বাইরে গিয়ে ফেলে দেন।

আনোয়ারুল আজীম হত্যার ঘটনায় ভারতের কলকাতা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খুনের আগে লাশ গুমের পরিকল্পনা সাজান খুনিরা। এ জন্য তারা ট্রলি ব্যাগ, চাপাতি, ব্লিচিং পাউডার, পলিথিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে রাখেন। ১৩ মে কলকাতার নিউ টাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেনসের ফ্ল্যাটে আনোয়ারুলকে হত্যার পর লাশ টুকরা টুকরা করে ব্যাগে ভরে সরানো হয়েছে। এর কিছু অংশ কলকাতার একটি খালে ফেলা হয়েছে। কলকাতার পুলিশ খুনিদের ভাড়া ফ্ল্যাটের ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং ঢাকায় গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।