র্যাব ও এসবি প্রধানের চুক্তিতে ক্ষোভ
নির্বাচন ঘিরে পুলিশে বড় রদবদল

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশ প্রশাসনের বড় ধরনের রদবদল আসছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে জেলার পুলিশ সুপার, মেট্রো কমিশনার ও বাহিনী প্রধান পর্যায়ে বদলির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে র্যাবের মহাপরিচালকের দ্বিতীয় দফার ও এসবি প্রধানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে পুলিশ সার্ভিসে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির নেতৃত্বে সিনিয়র কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে দেখা করে পুলিশে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বহুল আকাঙ্ক্ষিত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে পুলিশ বিভাগ। পুলিশের প্রতিটি স্তরে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের উদ্যোগ দেয়া হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার আগেই শেষ হতে যাচ্ছে এসবি প্রধান ও র্যাব মহাপরিচালকের চাকরির মেয়াদ। সরকারি ঊর্ধ্বতন সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজিপি গোলাম রসুল ও মহাপরিচালক র্যাব একে এম শহিদুর রহমানের চাকরির মেয়াদ ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন
এ খবরে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ড. নাজমুল করিম খানের নেতৃত্বে গত বুধবার পুলিশ কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে দেখা করে এর প্রতিবাদ জানান। সূত্র জানায়, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মুসলেহ উদ্দিন, আকরাম হোসেন, রফিকুল ইসলাম, কাজী ফজলুল করিমসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে বলেন— যদি যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মকর্তা না পাওয়া যায় তখনই অভিজ্ঞদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যেহেতু পুলিশে বিপুল সংখ্যক পদোন্নতি বঞ্চিত যোগ্য কর্মকর্তা কর্মরত আছেন, তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত করা ঠিক হবে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বিষয়ক উচ্চতর কমিটির এক সভা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিল্প, নৌ-পরিবহন, স্থানীয় সরকার ও আইন উপদেষ্টাসহ কমিটির সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সবাই নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের মাঠ পর্যায়ে সর্বত্রই রদবদলের সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য যোগ্যতা সম্পন্ন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ সুপার ফিট লিস্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে ওসি ও এসপি নিয়োগ করা হবে। সকল রেঞ্জের নতুন ডিআইজি ও মেট্রোপলিটনের নতুন কমিশনার নিয়োগ করা হবে। তাদেরকে আগে থেকেই নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মোতাবেক প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন
সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের শূন্য পদে পদায়নের প্রস্তাব করা হয়। আইজিপির পরে পুলিশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গদী অতিরিক্ত আইজিপি প্রশাসন পদে টেলিকমের অতিরিক্ত আইজিপি আওলাদ হোসেন, টেলিকমের অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম, এপিবিএনের অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত আলী হোসেন ফকির, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত আইজিপি শূন্য পদে সিলেটের কমিশনার রেজাউল করিমকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তবে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজকে পদোন্নতি পাওয়ার পরেও কোনো পোস্টিং দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহারসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে নতুন কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপারদের অনেক আগ থেকেই প্রত্যাহারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে অনুরোধ করেছিল। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায় আলোচিত নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়।
২৪তম ব্যাচের পুলিশ সুপারদের দায়িত্ব পালন করা কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ ও ফেনী জেলা পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সময় সরকারের শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজিপি ও র্যাবের মহাপরিচালকের নির্বাচনকালীন সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের বিবেচনা করে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কথা জানানো হয়।
শীর্ষ এই দুই কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভের খবরে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। পরদিনই তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে দল বেঁধে সাক্ষাৎ করে অসন্তোষের বিষয়টি অবহিত করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুলিশের দীর্ঘদিনের রেওয়াজে নেই। বিগত ২০ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুনকে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে পুলিশের আইজিপি বাহরুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী ও র্যাব মহাপরিচালক একে এম শহিদুর রহমান দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।
বিশেষ করে পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকার কমিশনার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভের এক বছরেও ঢাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো সন্তোষজনক উন্নতি করতে পারেননি। পুলিশের চেইন অব কমান্ড ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্যতম বাধা বলে জানা গেছে। উপরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নিচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে গেছে।
১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চার বছর ধরে অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। অপরদিকে পুলিশের ১৫তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এখনো ডিআইজি অর্থাৎ যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় আছেন। ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ডিআইজি পদে কর্মরত। প্রশাসনের ২০তম ব্যাচ যেকোনো সময় অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি পাবে। আর পুলিশের ২০তম ব্যাচের অধিকাংশই এখনো অতিরিক্ত ডিআইজি। ফলে পুলিশের স্বাভাবিক পদোন্নতি আটকে কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভের খবরে র্যাবের প্রধান ও এসবি প্রধান নিয়ে পুলিশের কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। র্যাবের মহাপরিচালক এক বছরের চুক্তি এখন শেষ পর্যায়ে। আবার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে চান। তারা আবারো এক্সটেনশন পেলে অনেক কর্মকর্তারই বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যাতে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হবে হতাশা।
ডিজি র্যাব একে এম শহিদুর রহমান ২০১৩ সালে নিয়মিত পদোন্নতিতে অতিরিক্ত ডিআইজি হন এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) হিসেবে পদায়ন পান। ২০১৬ সালে নিয়মিত পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে ডিআইজি হন। ডিআইজি হিসেবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স এবং টেলিকমে পদায়ন পান। ২০২৪ সালের মে মাসে ১০ জন ডিআইজি সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনিও তাদের মধ্যে একজন। ৫ আগস্টের পূর্বে তিনি এবং কৃষ্ণপদ রায় সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত আইজিপি থেকে নিয়মিত অতিরিক্ত আইজিপি পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে পদায়ন পান। ৫ আগস্টের পরে ডিজি র্যাব হিসেবে পদায়িত হন। সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ তিনি এক বছরের জন্য এক্সটেনশন পান এবং গ্রেড ওয়ান পান। আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ তার এক বছরের এক্সটেনশনের মেয়াদ শেষ হবে। তিনি দ্বিতীয়বার এক্সটেনশনের জন্য দরখাস্ত করেছেন।
স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজিপি গোলাম রসুল পুলিশের মাঝে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তার নেতৃত্বে ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৩৫ পৃষ্ঠার গবেষণা হয় যার শিরোনাম— “Vision of Lwa Enforcement : Policing in Bangladesh”।
কিছুদিন আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন।