গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের পথে ইসি-সরকারের সমন্বয়হীনতা বড় চ্যালেঞ্জ: টিআইবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের গণ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সমন্বয়হীনতা, অস্পষ্ট আইনগত অবস্থান এবং রাজনৈতিক চাপ বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
আরও পড়ুন: ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, গণবিজ্ঞপ্তি জারি
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বের গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, দুর্বল আইনি ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা প্রয়োগে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় ও স্বাধীন অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: আজ থেকে মাঠে নামবেন ১০৫১ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট: ইসি মাছউদ
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশও নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনা উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট অপসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলেও অভিযোগ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তার ভাষায়, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বড় ভূমিকা রাখছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সমন্বয় না থাকায় ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণও ব্যাহত হচ্ছে।
গণভোট ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোদুল্যমান আচরণ করছে। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় জারি করা অধ্যাদেশ গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রশ্নকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সবচেয়ে বড় আইনি সমস্যার জায়গা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে গণভোটকে নির্বাচনের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তফশিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পূর্বানুমতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মত দেন।
এছাড়া ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনায় অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’ হওয়া উচিত গণভোটের মূল ভিত্তি। এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।
এ লক্ষ্যে টিআইবি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ আসনে উন্নীত করা এবং অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এবং ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্য নিয়োগের দাবিও জানানো হয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘না’ এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে জনগণকে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান।





