৭০ লাখ টাকার লেনদেনের গুঞ্জন
দুদকের মামলার আসামিকে ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়ন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এজাহারভুক্ত মামলার আসামি এবং ১ কোটি ২২ লাখাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিতর্কিত কর্মকর্তা মো. ছাবের আলীকে ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন করা হয়েছে। আজ ২৪ জুন, ২০২৬ তারিখে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই বদলি করা হয়। একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে মাঠপর্যায়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় সারাদেশে এলজিইডির সাধারণ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করেই প্রতারণামূলকভাবে সরকারি তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মো. ছাবের আলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ১০৯ ধারা সহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এই মামলাটি দায়ের করেন।
আরও পড়ুন: তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীঘেঁষা নিম্নাঞ্চলে মাথা চাঁড়া দিচ্ছে বন্যা
মামলায় মো. ছাবের আলী (তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, ঢাকা) ছাড়াও এলজিইডির তৎকালীন ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শামস জাভেদ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ ইঞ্জিনিয়ার্স-এর মালিক আবু সাইদ খানকে আসামি করা হয়। গত ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে এই মামলার বিবরণী মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
ছাবের আলীর চাকরি ও পদোন্নতির ইতিহাস
আরও পড়ুন: কালীগঞ্জে আ. লীগ নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৮
অফিসিয়াল নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা মো. ছাবের আলী ২০০৫ সালে বিএসসি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। একই বছরের ১৪ জুন তিনি ‘আরইআরএমপি-২’ (RERMP-2) প্রকল্পে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে প্রথম যোগদান করেন। ২০১১ সালের ২৫ আগস্ট তাকে সহকারী প্রকৌশলী পদে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করা হয়।
পরবর্তীতে, ২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর তিনি সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। এর পর, গত ২ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এলজিইডির ১৯৭ জন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে একসঙ্গে ‘নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব)’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, ছাবের আলী ছিলেন তাদেরই একজন।
দুদকের মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা সদর দপ্তর থেকে সরিয়ে তাকে ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী করার ঘটনাটি এলজিইডিতে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অধিদপ্তরজুড়ে জোর গুঞ্জন উঠেছে যে, এই লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারটি পেতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে প্রায় ৭০ লাখ টাকার অনৈতিক লেনদেন হয়েছে।
তবে অধিদপ্তরের পদস্থ একটি সূত্র দাবি করেছে, এই বদলির পেছনে প্রধান প্রকৌশলীর একক সিদ্ধান্ত ছিল না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবের সরাসরি ‘মৌখিক নির্দেশনা’ ছিল। সেই বিশেষ মৌখিক রাজনৈতিক চাপ ও নির্দেশনার আলোকেই জুন ক্লোজিং শেষ না হতেই প্রধান প্রকৌশলী তড়িঘড়ি করে এই অফিস আদেশটি (স্মারক নং-৪৬.০২.০০০০.০০১.৯৯.১১৮.১৭-৬৩৮১) জারি করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি সূত্রের দাবি, এলজিইডির বদলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এ বিষয়ে তারা কিছু জানেন না।
সুশাসন নিশ্চিতের পরিবর্তে এভাবে মামলার আসামিদের পুরস্কৃত করায় এলজিইডির সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি কি তবে কেবলই কাগজে-কলমে?





