জামিনের আশ্বাসে এক কোটি টাকার প্রস্তাব

আইসিটির প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে গুরুতর ঘুষ দাবির অভিযোগ : ফোনালাপ সংরক্ষণের দাবি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৬:৪৭ অপরাহ্ন, ১০ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৩ অপরাহ্ন, ১০ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সদ্য সাবেক এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলায় আসামিকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠার পর বিষয়টি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসার পর রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়।

মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না এলেও প্রসিকিউটর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করা হবে।

আরও পড়ুন: গণভোটের আগে সংসদ-সংবিধান সংস্কারে আলোচনার পথেই সিদ্ধান্ত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। পরিবারের দাবি, এ সংক্রান্ত একাধিক ফোনালাপের অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং কথোপকথনে অগ্রিম প্রায় ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।

তবে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, কোনো একক প্রসিকিউটরের পক্ষে জামিন নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।

আরও পড়ুন: বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্তের দাবি

অভিযোগ প্রকাশের পর চিফ প্রসিকিউটরের বৈঠক

অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে প্রসিকিউটরদের নিয়ে বৈঠক করেন।

তিনি বলেন, সংবাদটি তিনি বাসায় বসে দেখেন এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত প্রসিকিউশন টিমকে ডেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “যদি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমার কাছে আসে, তাহলে আইনের মধ্যে থেকে যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না এলেও প্রসিকিউটর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হবে।”

তিনি আরও জানান, ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর থেকে সামগ্রিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করার জন্যও একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঘুষ দাবির অভিযোগ: 

অভিযোগ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. সাইমুম রেজা তালুকদার চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন।

পরিবারের দাবি, ফোনালাপে তিনি ইঙ্গিত দেন যে মামলার আইনি প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে জামিনের বিষয়টি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক প্রত্যাশার কথা বলেন।

পরিবারের ভাষ্যমতে, কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি অগ্রিম অর্থের বিষয়ও তোলেন এবং প্রায় ১০ লাখ টাকা নগদ অগ্রিম দেওয়া হলে তা সুবিধাজনক হবে বলে মন্তব্য করেন।

অডিও রেকর্ড সংরক্ষণের দাবি: 

সংশ্লিষ্ট পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সাবেক এই সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস পর প্রথমবার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার।

প্রাথমিক কথোপকথন রেকর্ড করা না হলেও পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ফোনালাপ সংরক্ষণ করা হয়। পরিবারের দাবি, এসব কথোপকথনে তিনি মামলার অগ্রগতি প্রভাবিত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন এবং ‘ব্যবস্থা করা গেলে’ বড় অঙ্কের অর্থের প্রত্যাশা থাকবে বলে উল্লেখ করেন।

তবে এসব অডিও রেকর্ড স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মামলার প্রেক্ষাপট: 

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার ও দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম শহরে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ওই ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। একই ঘটনায় দণ্ডবিধির আওতায় করা মামলাতেও তাঁকে ফৌজদারি আদালতে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার : 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

তিনি বলেন, কোনো বিচারাধীন মামলায় জামিনের মতো বিষয় কোনো একক প্রসিকিউটরের হাতে নির্ভর করে না; এটি পুরো প্রসিকিউশন টিম ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।

পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই তিনি তাঁর আগের পেশা শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন এবং সেই কারণেই প্রসিকিউটরের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

২০২৪, ৭ অক্টোবর : 

সাইমুম রেজা তালুকদার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান।

২০২৪, জুলাই: 

চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তী সময়

তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

২০২৫ সালের শেষের দিকে

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রসিকিউটরের সঙ্গে হওয়া ফোনালাপ সংরক্ষণ শুরু করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়

ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রকাশের পর চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে বৈঠক ও তদন্তের ঘোষণা।

কে এই সাইমুম রেজা তালুকদার ?  

★ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক প্রসিকিউটর। 

★ পেশায় শিক্ষক; একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ছিলেন

★ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। 

★ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার আগে আদালতে মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম ছিল তার।