প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত

আয়না ঘরের ক্ষতচিহ্ন, সিটিটিসি ও এটিইউ বিলুপ্ত

Sanchoy Biswas
মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব
প্রকাশিত: ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ১:১৯ পূর্বাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিতাড়িত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে আলোচিত আয়না ঘরের আদলে বন্দিশালায় নিষ্ঠুর নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন বহনকারী ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এই দুটি ইউনিটের জনবল ও লজিস্টিক ব্যবহার করে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ) নামে নতুন আরেকটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত নবগঠিত সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৩০ এপ্রিল সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে সহ-সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলামকে প্রধান সমন্বয়কারী করে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটিতে সকল গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান, পুলিশের আইজিপি, বিজিবি প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, কেবিনেট সচিবসহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট প্রধানদের সদস্য ও সহায়তাকারী হিসেবে রাখা হয়। এই কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক মঙ্গলবার বিকেলে পরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন: কাঁটাতার ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনে গঠিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) গোপন বন্দিশালায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামা, রাজনীতিবিদ ও এনজিও-সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ধরে এনে বিনা বিচারে, মামলা ছাড়াই আটকে রাখার অভিযোগ ছিল। আলোচিত আয়না ঘরের আদলে এখানেও নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগ বিদ্যমান। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে উগ্রপন্থী কিছু কর্মকাণ্ডে সরকার এগুলো দমনের জন্য নতুন আদলে কর্মসূচি নিয়েছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জঙ্গিবাদী, উগ্রবাদী, কিশোর গ্যাং ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দমনে নতুন পদ্ধতিতে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গঠন করে। এরই ধারাবাহিকতায় সিটিটিসি ও এটিইউ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিলুপ্ত করা দুটি ইউনিটের বিকল্প কার্যক্রম চালানোর জন্য বাংলাদেশবিরোধী উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীদের দমনে গঠিত নতুন ইউনিটের নাম ঠিক করা হয়েছে স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)। এর প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত আইজিপি। সিটিটিসি এবং এটিইউর জন্য নিজস্ব কোনো অফিস ছিল না। বারিধারায় ভাড়াবাড়িতে চলছিল অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা প্রাঙ্গণে চলছিল সিটিটিসির কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগদান করা কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন এসএসইউর জন্য ডিএমপির সিটিটিসির জন্য নির্মাণাধীন আগারগাঁওয়ের দশতলা ভবনটি দ্রুত মেরামত করে নতুন ইউনিটের জন্য প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিটের ঢাকা মহানগরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ডিএমপির ডিবিতে সিটিটিসি ভবনটি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিটের ঢাকা মহানগরের দায়িত্বে থাকবেন পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সামনে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যে দুই ডিআইজিকে আইজিপির সতর্কতা

সূত্র আরও জানায়, সিটিটিসি ও এটিইউ একীভূত করে এই দুটি ইউনিটের জনবলও একীভূত করে নতুন অর্গানোগ্রাম ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান এটিইউর অতিরিক্ত আইজিপি প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটের প্রধান হিসেবে প্রাথমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। সিটিটিসির প্রধানও নতুন ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত হবেন।

সূত্র জানায়, দেশে ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালে ডিএমপির একটি বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি গঠন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর কাজের এলাকা ঢাকা মহানগর। এটি সাতটি উপবিভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে— স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ (সোয়াট), সাইবার ক্রাইম তদন্ত বিভাগ, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও বিশেষ প্রশিক্ষিত কে-নাইন টিম (K-9)। ঢাকায় বড় কোনো ইভেন্ট হলে সোয়াট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর ওই বছর সিটিটিসি কল্যাণপুর, শাহ আলী, বংশাল, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, আশকোনা, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের পাতারটেক, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তখন বলেছিল, ওসব বাড়ি ‘জঙ্গি আস্তানা’। অভিযানে কল্যাণপুরে ‘নব্য জেএমবির’ নয়জন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় তিনজন, গাজীপুরের পাতারটেকে সাতজনসহ বিভিন্ন স্থানে অনেকে নিহত হন। পুলিশ নিহত ব্যক্তিদের জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

সিটিটিসির ওই সব অভিযান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

সিটিটিসি গঠনের এক বছর পর, ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) গঠন করে। সারা দেশে কাজ করা এই ইউনিটের প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।

গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউর কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। এ দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম, আটক রাখা, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক এবং বর্তমান সংসদের বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। নির্যাতন করা হতো।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও সিটিটিসি ও এটিইউর বিরুদ্ধে নির্যাতন এবং এগুলোর গোপন বন্দিশালা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।