রাজনৈতিক দলগুলোর বাজেট পর্যালোচনা
নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি: ফখরুল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল বিএনপি। সেই সরকারের প্রায় ১০০ দিন পর বৃহস্পতিবার প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়, এরই মধ্যে ঘোষিত এই বাজেট নিয়ে রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ব্যাপক সমালোচনা শুরু করেছেন।
তাদের মতে, এই বাজেট বাস্তবতার চেয়ে কাগুজে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বেশি। বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে বিএনপি এই বাজেটকে একটি ‘জনবান্ধব’ বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছে। উল্টো চিত্রে এই বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’, ‘গণবিরোধী’ ও ‘বাস্তবায়নে দুর্বল’ আখ্যা দিয়েছে সিপিবি, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য দল।
আরও পড়ুন: বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ নেই: এনবিআর চেয়ারম্যান
রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, বাজেট জনবান্ধব হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিশাল ঘাটতি পূরণে এর বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সিপিবি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) বাজেটকে ‘গণবিরোধী’ ও ‘ফাঁকা’ আখ্যা দিয়েছে। দলটির নেতারা জানান, এটি কেবল আকারেই বিশাল, কিন্তু বাস্তবায়নের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই এবং এটি বৈষম্য আরও বাড়াবে।
আরও পড়ুন: ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুই গণতান্ত্রিক দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রস্তাবিত বাজেটকে অতি উচ্চাভিলাষী বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, এতে এমন অনেক লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে, যা অবাস্তব।
একই সুরে কথা বলেছেন জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য বাম ও প্রগতিশীল জোটের নেতারা। তারা বলেছেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক সুযোগ রাখা হয়েছে। করের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে রেখে ধনীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, এ বাজেটে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া খাতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে, নতুন ক্রীড়া আয়োজন করা হবে এবং খেলাধুলার পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা এবং দেশের ৬৪ জেলায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি খাতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে। ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, বুননশিল্প, শীতলপাটি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে চিহ্নিত করে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হবে। লোকজ ও হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট: জামায়াতে ইসলামী
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট হিসেবে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাজেটকে দুর্নীতি ও লুটপাটের বাজেট বলেও আখ্যা দিয়েছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দলটি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই বাজেটের প্রধান দুর্বলতা বাজেট ঘাটতি। ঘাটতির একটা মাত্রা থাকে, কিন্তু এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট।
তিনি বলেন, এই বাজেটে ঋণের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। ফলে এই ঘাটতি কোথা থেকে পূরণ করা হবে? এই বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, করের উৎস তৈরি করছি। তিনি শব্দের চালাকি করে জনগণের ওপর করের বোঝা তুলে দিচ্ছেন। করের বোঝা মানুষের আরও দুর্ভোগ বয়ে আনবে।
তিনি বলেন, এই বাজেট মানুষকে দেখানোর জন্য করা হয়েছে। এই বাজেট বাস্তবায়নে লুটপাট হবে।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গণবিরোধী এই বাজেটের নিন্দা জানাই। আমরা আহ্বান জানাই, একটি জনকল্যাণমূলক বাজেট দেওয়া হোক।
ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে
প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি ও সংকট সৃষ্টি করবে। এই ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এবি পার্টির নেতৃদ্বয় যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে গভীর সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এই বাজেটে নেই।
তারা বলেন, প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবতার চেয়ে কাগুজে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বেশি।
দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন, ব্যয়সংকোচন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে বাজেট পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।
বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না: নাহিদ ইসলাম
বিএনপি সরকারের ঘোষিত নতুন (প্রস্তাবিত) বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক কোনো সংস্কার হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সরকারের এই বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক বলেন, আমরা আশা করেছিলাম এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে; কিন্তু বর্তমান বাজেটের যে রূপরেখা, তাতে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না।





