পেটাও না কেন, মারো না কেন ওদের

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২:৪৫ পূর্বাহ্ন, ০৭ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৭ পূর্বাহ্ন, ০৭ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের দ্বিতীয় দিনে একটি কল রেকর্ড দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এটি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মধ্যকার কথোপকথন। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

আদালতে উপস্থাপিত অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, সাদ্দাম হোসেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রীকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, জমায়েত ও সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে অবহিত করছেন। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কথা শুনে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়— 'তোমরা কিছু করো না কেন? মারো না কেন ওদের? চড়াও হতে দাও কেন ওদের?' জবাবে সাদ্দাম হোসেন তাদের 'নিষেধ করা হয়েছে' জানালে ওবায়দুল কাদের বলেন, 'তোমরা বললা আজকে থেকে হালকা হয়ে যাবে সব। কই হালকা হইল? জমায়েত মানে এখানে জামায়াত আর বিএনপি যোগ হইছে।'

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনাকে বক্তব্যের সুযোগ দিয়ে জুলাই শহীদদের অসম্মান করেছে ভারত: রিজভী

তখন সাদ্দাম বলেন, 'রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশ' পেলে তারা সেটি করতে পারবেন। তবে সেদিন শাহবাগের দিকে বা আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি হতে তাদের পুলিশ ও 'বিপ্লব দা'র পক্ষ থেকে বারবার নিষেধ করা হয়েছে।

শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৪ সালের ১১ জুলাইয়ের ওই কথোপকথনের রেকর্ডটি সিআইডির তরফে ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অধীনস্থ কাউকে 'পিটাও না কেন ওদের, মারো না কেন, বাড়তে দাও কেন'— এই ধরনের নির্দেশ দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে স্পষ্টত 'উসকানি' (ইনসাইটমেন্ট) দেওয়ার অপরাধ।

আরও পড়ুন: গ্যাসের দাম এক টাকাও বাড়ানো হলে সরকার টিকতে পারবে না: নাহিদ ইসলাম

প্রসিকিউটর বলেন, সামনে বলছেন প্রতিরোধ, কিন্তু ফোনে এবং কার্যকরভাবে উনারা আসলে প্রতিরোধ না, আক্রমণের কথাই বলেছেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর 'রাজাকার' মন্তব্যের পর ওবায়দুল কাদেরের 'উসকানিতেই' ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেলে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতার ওপর 'সশস্ত্র' হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও 'উসকানিদাতা' হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম আসার কথা বলেন এই প্রসিকিউটর। গাজী এমএইচ তামিমের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলা ও হত্যাকাণ্ড কেবল একক নির্দেশে হয়নি, বরং এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি 'সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত'।

যুক্তিতর্কে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের একটি ফোনালাপও তুলে ধরে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ১৫ জুলাইয়ের ঘটনায় মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া পলাতক অন্য ছয় আসামি হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

গত ২ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর যুক্তিতর্ক শুরু হয়। আগামী রোববার এ মামলার পরবর্তী যুক্তিতর্ক শুনানি হবে।

সাবেক ভিসি মাকসুদ ও জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন:

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জুলাই গণআন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিন, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানসহ মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনের কাছে মামলার খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, নির্যাতন, উসকানি ও সহিংস কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনার মতো প্রাথমিক প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিবেদনটি এখন প্রসিকিউশন পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজনীয় সংশোধন, তথ্য-উপাত্ত ও আইনগত দিক যাচাই-বাছাই শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিন, লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানসহ মোট আটজন।

জুলাই গণআন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হলো।