বাংলাদেশ কোথায় যাবে, তা অন্য কেউ ঠিক করবে না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো বিদেশি শক্তির ইচ্ছা বা চাপের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ যেখানে দাবি করবে, বাংলাদেশ সেখানেই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ কিংবা ভারত—কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকার সুযোগ নেই। জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার হিসেবে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক পরিসরে নিজের অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের স্বার্থে আমাদের যখন যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হবে, আমরা সেখানে যাব। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রে যাব, প্রয়োজন হলে চীনেও যাব। ভারতের সঙ্গে পরিবেশ অনুকূল হলে ভারতেও যাব। কিন্তু আমরা কোথায় যাব, তা অন্য কেউ নির্ধারণ করবে না।”
আরও পড়ুন: বগুড়ার তিন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশনা, গণশুনানি হবে
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ওয়াশিংটন, বেইজিং, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ১৫–১৭টি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা
তার ভাষ্য, “আমরা এখন এমন একটি অবস্থানে আছি, যেখানে নিজের স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারি, দর-কষাকষি করতে পারি এবং সমান মর্যাদার ভিত্তিতে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে পারি।”
চীন সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নানা বিষয় সফরে গুরুত্ব পাবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে মালয়েশিয়াকে মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল শ্রমবাজার বা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক কৌশলগত স্বার্থও জড়িত।
তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের সদস্যপদের জন্য কাজ করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সিপিটিপিপি (কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) বাণিজ্য কাঠামোয় প্রবেশের বিষয়েও আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রীর সফরগুলোতে এসব বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি সক্রিয় ও দায়িত্বশীল অংশীজন। আমরা নরম শক্তি, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাই। সবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে সর্বাগ্রে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।”
সরকারি সফরে অতীতের অপচয় ও বড় বহরের সংস্কৃতি থেকে সরে আসার কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জানান, মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা ২৭ জন এবং চীন সফরে ২৮ জন। প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদেরই সফরসঙ্গী করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আগের মতো বিমানভর্তি লোক নিয়ে বিদেশ সফরের যুগ শেষ। এখন প্রতিটি সফর, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ব্যয় জনগণের অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করেই করা হচ্ছে।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা স্পষ্ট—যাদের মালয়েশিয়ায় প্রয়োজন তারা মালয়েশিয়া যাবেন, যাদের চীনে প্রয়োজন তারা চীন যাবেন। ব্যক্তিগত আগ্রহ বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন এবং জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখেই বিদেশ সফর পরিচালিত হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, মালয়েশিয়া ও চীন—উভয় সফরই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।





