বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা: বহুমুখী সংকটে দেশীয় চা শিল্প
চা-বাগান মালিকের আক্ষেপ
‘আমাদেরকে সবাই "বড়লোক" হিসেবে চিনে; সবাই জানে, আমরা শ্রমিক ঠকাই’
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল
উৎপাদন বেড়েছে, দেশীয় বাজারে চাহিদাও শক্তিশালী। তবুও বাংলাদেশের চা শিল্প এখন টেকসই উন্নয়নের কঠিন পরীক্ষায়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো, ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা এবং চা শ্রমিকদের মানবাধিকার ও জীবনমানের সংকট সব মিলিয়ে দেশের শতবর্ষী এই শিল্পটি চাপের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘টি ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ: অ্যা ভায়াবিলিটি স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। গত এক বছর ধরে মোট ২৫টি ছোট-বড় চা-বাগান এবং ক্ষুদ্র চা-চাষী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে ওই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, ২০২৩ সালে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হলেও ২০২৪ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দেড় কোটি কেজি কমে উৎপাদন নেমে আসে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজিতে। আলোচ্য বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি। উল্লেখ্য, দেশের মোট উৎপাদনের অর্ধেকই আসে মৌলভীবাজার থেকে। এরপর রয়েছে হবিগঞ্জ, পঞ্চগড় ও চট্টগ্রাম। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান কামরান টি রহমান দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, আমরা যারা চা-বাগানের ঐতিহ্য ধরে রেখেছি, তারা সবাই লোকসান গুনছি। আমাদেরকে সবাই ‘বড়লোক’ হিসেবে চিনে। সবাই জানে, আমরা শ্রমিক ঠকাই। তাই আমাদের দুঃখ কেউ শুনতে চায় না। বিশ্বাস করতে চায় না। এটি একটি বড় সংকট। প্রকৃত চিত্র উল্টো।’ একসময় বিশ্বে চা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। কিন্তু গত এক দশকে সেই অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। রপ্তানিতে বর্তমান অবস্থান অষ্টম স্থানে। বর্তমানে উৎপাদিত চায়ের ৯৭ শতাংশই দেশের বাজারে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালে উৎপাদিত ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি চায়ের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি। একই সময়ে দেশে বছরে গড়ে প্রায় ২৫ লাখ কেজি চা আমদানি করতে হচ্ছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধিই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
আরও পড়ুন: ন্যাম ফ্ল্যাটে বহিষ্কৃত জামায়াত এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় শিল্পটির সামনে কয়েকটি বড় ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদনশীলতার বৈষম্য, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরা, পুরোনো চা গাছ, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত চায়ের পরিবর্তে নিম্নমূল্যের বাল্ক চায়ের ওপর নির্ভরতা। এছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত ও কম বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা চা গাছের বৃদ্ধি, কুঁড়ি উৎপাদন ও পাতার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে অনেক বাগানে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং সেচ, রোগবালাই দমন ও বাগান ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও নিলামে চায়ের দাম সেই অনুপাতে না বাড়ায় অনেক বাগান আর্থিক চাপে পড়ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও নিলামে চায়ের দাম সেই হারে না বাড়ায় অনেক বাগান আর্থিক চাপে পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক চা বাগান ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে তারা নতুন ঋণ পাচ্ছে না। মৌসুমের শুরুতেই কার্যকর মূলধনের অভাবে শ্রমিকের মজুরি, বাগানের পরিচর্যা ও কারখানা পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও মান দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গবেষণায় চা শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক শ্রমিক এখনও পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটেশন, নিরাপদ আবাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
গবেষকদের মতে, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত না করলে উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চা শিল্পকে টেকসই করতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার (ক্লাইমেট অ্যাডাপ্টেশন) উদ্যোগ জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই চা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন, পুনঃরোপণ কর্মসূচি জোরদার, সহজ শর্তে ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, নিলাম ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা, মূল্যসংযোজিত ও জৈব চা উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শিক্ষা ও নিরাপদ পানীয় জলের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।





