কুইক চিকস্ চেয়ারম্যান পদে বহাল
নিয়োগের শর্ত লঙ্ঘনসহ গুরুতর অভিযোগ গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানার বিরুদ্ধে
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শর্ত লঙ্ঘনসহ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দ্বিতীয় দফায় পরিচালক নিয়োগ পেয়ে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে তাকে অপসারণ করে তার নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত নিয়ে দুদকে মামলা করার দাবি জানিয়েছেন।
চলতি বছর ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ১০(২) অনুযায়ী মিজ আফসানা বেগমকে অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয়। এর আগেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে দুই বছরের জন্য পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরও তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসাসহ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বরং উল্টো এগুলো সরকারি চাকরির শর্তে নেই বলে জোরালো মন্তব্য করে খোলামেলা কথাবার্তা বলছেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বুধবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিজ আফসানা বেগম ১ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে কৃষি ও পোল্ট্রি খাতে বড় বিনিয়োগে ‘কুইক চিকস লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান পদে দীর্ঘদিন ধরেই বহাল আছেন।
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (RJSC) থেকে প্রাপ্ত কর্পোরেট নথি এবং স্মারকলিপি (Memorandum of Association) পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত, যার নিবন্ধন নম্বর ৬৪৫২১(২০১৩)/০৬।
আরও পড়ুন: গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু
কোম্পানিটির অনুমোদিত শেয়ার মূলধন ১,০০,০০,০০০/- (এক কোটি) টাকা, যা প্রতিটির মূল্য ১০০/- টাকা মূল্যের মোট ১ লক্ষ সাধারণ শেয়ারে বিভক্ত। প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো অনুযায়ী, কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছেন দুইজন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এর মধ্যে জনাব মুসাব্বের হোসেন ধারণ করছেন ৮,০০০ শেয়ার এবং বেগম আফসানা বেগম ধারণ করছেন ২,০০০ শেয়ার। প্রাথমিক মূলধনে এই পরিবারের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১০ লক্ষ টাকা, যা পর্যায়ক্রমে ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি করা হবে।
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেগম আফসানা বেগম কোম্পানির প্রথম ৫ বছরের জন্য চেয়ারম্যান এবং মুসাব্বের হোসেন প্রথম ৫ বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কোম্পানির ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ব্যাংকিং ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি বন্ধক রাখা এবং সব ধরনের কৃষিযন্ত্রপাতি ও ফিড আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের সুবিধার্থে যেকোনো বাণিজ্যিক বা সরকারি ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং তা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একক স্বাক্ষরে বা বোর্ডের সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে পরিচালনার পূর্ণ আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে আবারও দায়িত্ব পালন করলেও আফসানা উক্ত কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়ছেন না। বাংলাবাজার পত্রিকাকে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার নিয়োগের শর্তে বা সরকারি চাকরিতে ব্যবসা করা যাবে না— এমন কোনো শর্ত নেই। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না— এমন কোনো বিষয়ও উল্লেখ নেই। তিনি নিজেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত দাবি করলেও তিনি নিয়োগের কোনো শর্তই মানতে চাননি।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ফিরোজ মিয়া বলেন, সরকারি চাকরিতে যেভাবেই তিনি যোগদান করেন না কেন, সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালা ও আচরণবিধি সম্পূর্ণভাবে তার ওপর প্রযোজ্য বলে গণ্য হবে। সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন সরকারের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো ব্যবসা করতে পারবেন না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শর্ত হলো তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা। কারণ সরকারি চাকরি ব্যবহার করে তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারেন। সরকারের উচিত হবে তার বিষয়ে তদন্ত করে এ ধরনের আচরণের জন্য তাকে অপসারণ করা। গ্রহণ করা বেতন ফেরত নিয়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা করা উচিত। এ সরকার কেমন লোককে নিয়োগ দিচ্ছে, যারা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি মানতে চাচ্ছে না। এদের জন্য দীর্ঘদিনের জনপ্রশাসনের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ লাভের পর আফসানা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন,
আফসানা বেগম বলেন, “এতদিন একটা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম। ব্যক্তিগত রোষের শিকার হয়ে এখান থেকে আমাকে চলে যেতে হয়েছিল। এর চেয়েও বড় বিষয় ছিল, এখানে যে কাজগুলো চলছিল, বিশেষ করে পাঠকসমাজ নিয়ে দ্রুতগতিতে অনেক কাজ এগোচ্ছিল,
“এখন সেগুলো আবার শুরু করতে পারব, এই আনন্দেই খুব ভালো লাগছে।
এর আগে গত জানুয়ারিতে কোনো ধরনের 'কারণ ব্যাখ্যা' না করেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে আফসানা বেগমকে অব্যাহতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
সরকার যখন এই প্রজ্ঞাপন জারি করে, তখন আফসানা বেগম তার সহকর্মীদের সঙ্গে চার দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ঢাকার বাইরে অবস্থান করছিলেন।
তার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয় কবি-প্রবন্ধকার এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহকে, যিনি সাখাওয়াত টিপু নামে পরিচিত।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন আফসানা বেগম। তিনি বই নির্বাচন নীতিমালার সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, যেন অযোগ্য বই সরিয়ে ভালো বই নেওয়া হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।
এজন্য নীতিমালা সংশোধন করে সচিব ও মন্ত্রী কোটা ২০ শতাংশ তুলে দিয়ে ১০০ শতাংশ বই নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে আনতে চেয়েছিলেন আফসানা। কিন্তু তাতে সম্মতি ছিল না সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর।
এ বিষয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়গুলো পরে ফেসবুকে প্রকাশ করেন আফসানা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন আফসানা বেগম পরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তার বইয়ের সংখ্যা ২৪। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিচ্ছায়া, বেদনার আমরা সন্তান, আমি অথবা আমার ছায়া, দিনগত কপটতা। অনুবাদ করেছেন নাদিন গর্ডিমার, উইলিয়াম ফকনার, হুলিও কোর্তাসার, অ্যালিস মানরো, আইজাক আসিমভ ও ফিদেল কাস্ত্রো।





