দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান: মত পার্থক্য থাকতে পারে, ঐক্য যেন নষ্ট না হয়

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, ১৪ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, ১৪ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দলীয় নেতাকর্মীদের বিগত ১৭ বছরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মত পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু তার জন্য যেন ঐক্য নষ্ট না হয়। বিগত সময়ে সবাই যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, আগামীতেও সেভাবে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। বিগত নির্বাচনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঠিক সেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে জিতিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ঐক্য থাকলে ফ্যাসিস্ট, গুপ্ত কেউ ঢুকতে বা সুবিধা করতে পারবে না। ঐক্যে ফাটল ধরলেই তারা সবাই সুবিধা নেবে।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

আরও পড়ুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি, ওয়াকআউট বিরোধী দলের

বিগত ১৭ বছরের কথা মনে করিয়ে দিয়ে নেতাকর্মীদের তিনি বলেন, 'আপনারা দলকে গত ১৭ বছরে টিকিয়ে রেখেছেন, তখন গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার হয়েও আপনারা সবাই মিলে দল সামলিয়েছেন না? এই সময়ে আপনারা নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন, টাকা খরচ করেছেন। টেনশন, যন্ত্রণা দলের জন্য যেমন নিয়েছেন, তেমন নিজের পরিবারের জন্যও কি নিয়েছেন? না। এভাবে দেশের সকল বিএনপি নেতাকর্মীরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখন সেই নির্যাতনের ভয় নেই। তখন সবাই সবার পাশে থেকে দল চালাতেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন কেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবেন না।'

এসময় হাইব্রিড আর গুপ্তদের বিষয়ে সতর্ক করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। তারা এখনও বসে আছে, আরেক গ্রুপ দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্র করছে। দল অবশ্যই সুসংগঠিত করতে হবে। দল গোছাতে হাইব্রিড এবং গুপ্ত—এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তারা যেন দলের নেতৃত্বে ঢুকতে না পারে।

আরও পড়ুন: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে ফিরলেন আফসানা বেগম

নেতাকর্মীদের ত্যাগের বিনিময়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা কি চান, আপনাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক। তাহলে তৃণমূলে ঐক্য থাকতে হবে। তৃণমূল শক্তিশালী থাকতে হবে। আপনাদের কারণেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলীয় প্রধান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাচ্ছেন, সেখানে অনেক প্রস্তুতি দরকার, সেটা কি আপনাদের আছে? নেই। প্রস্তুতি না থাকলে জিততে পারবেন? না। না পারলে সরকার চলবে কেমনে? সরকার থাকতে পারবে? স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা অবশ্যই দেবো। বর্ষার পর আলোচনা করে ঠিক করবো। এর আগে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার হবেন। আর কে দল চালাবেন। আমরা দলকে নিয়ে সামনে চলতে চাই। সামনে এগোতে চাই।

হিন্দুদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাতে কেউ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সুযোগ নিতে না পারে, সেই নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী কয়েকদিন পর হিন্দুদের বড় অনুষ্ঠান। এখানে যারা আছেন তাদেরকে বলছি, আর যারা আসেননি আপনারা তাদের বলবেন, তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে সফল করতে হবে। যেন কেউ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। কেউ যেন সেই সুযোগটা না পায়।

বক্তব্যের শুরুতে বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি, অনিয়ম আর উন্নয়নের নামে লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে বলেন, 'গত ১৭ বছরে এত উন্নয়ন উন্নয়ন শুনতাম, আসলে উন্নয়নটা হয়েছে কোথায়? হয়েছে, তবে সেটা তাদের পকেটের উন্নয়ন। এখন দেখছি সেগুলো কোনো উন্নয়ন কোনো কাজে আসছে না। সব ক্ষেত্রে তারা ধ্বংস করে গেছে।'

উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্রিজের খরচ হয়েছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ পদ্মা সেতুর সমান ভুপেন হাজারিকা ব্রিজের খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। রূপপুরে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও তারা খরচ করেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন গত ১৭ বছরে প্রতি বছর ১৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

'উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তাঘাট করা'—এমন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে, কেন? ঢাকা শহরে বড় বড় ফ্লাইওভার দেখছেন, কিন্তু ড্রেন, খাল—এগুলো ভরাট হয়েছে। তাই সব জায়গায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। উন্নয়ন হবে, আমরা করবো। উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তাঘাট? আমরা উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলো ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ হাতে নিয়েছি। তবে এটা উপজেলা পর্যায়ে শুরু করেছিলেন আব্বা জিয়াউর রহমান, প্রথমে জিয়াউর রহমান ৩১ শয্যার হাসপাতাল করেন, তারপর আম্মা খালেদা জিয়ার সময় সেটি ৫১ শয্যায় উন্নীত হয়, আর আমরা করবো ১০১ শয্যার। বিশেষ করে অসুস্থ হলে শিশুদের খুব কষ্ট হয়, সারাদেশে ১০০০টি শিশু হাসপাতাল করবো। উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তাঘাটই নয়, সবকিছুর উন্নয়ন। সেগুলোও হবে। তবে শিশু হাসপাতাল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাল খনন—এসবও উন্নয়ন।

দেশের চরম সংকটকালীন সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর আরও কয়েকটি জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এসব প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, সে সম্পর্কে আপনাদের কম ধারণা নেই, খুব ভালো ধারণাই আছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, চিকিৎসা খাতও নাজুক, মহানগর-জেলায় যারা আছে তারা হয়তো কিছুটা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। কিন্তু উপজেলার অবস্থা খুব নাজুক। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধরে ধরে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আমাদের সার্টিফিকেটের বিদেশে কোনো মূল্য নেই। শিক্ষিতরাই বেশি বেকার। অল্প শিক্ষিতরা তবুও কিছু কাজ করে যাচ্ছে। এই কাজগুলো হয়নি, হওয়া উচিত ছিল। আর এগুলো না হওয়ার জন্যই জবাবদিহিতার দরকার। জবাবদিহিতা বলতে নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন হবে, মানুষ ভোট দিয়ে তাদের শাসক নির্বাচন করবে—এসব। গত ১৭ বছর জবাবদিহিতাও ধ্বংস করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এমন ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড দেবো, দিয়েছি। কৃষক কার্ড দেবো, শুরু করেছি। যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেসব বাস্তবায়ন শুরু করেছি। পরিকল্পনা ছিল বলেই কাজ শুরু করতে পেরেছি। এখন কী করেছি—আমরা দায়িত্ব নিয়েছি কবে, ফেব্রুয়ারিতে। তার একদিন পরেই রোজা। সেই রোজায় কিন্তু আমরা জিনিসপত্রের দাম বাড়াইনি। এবারের রোজা খুব স্বস্তিতেই পার হয়েছে। ভালোভাবেই চলেছে সবার। এরপর আবার শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। তখন সারা বিশ্বে তেলের দাম বাড়লো, সরবরাহ কমে গেল। ফলে আমাদের আড়াই বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ ২৫ হাজার কোটি টাকা—বাড়তি খরচ হয়েছে।

উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক পরিবারে ৫ জন বিভিন্ন কাজ করলে, একজনের ঘর গোছানোর কথা থাকলে, এখন সবাই মিলে যদি ঘর নোংরা করেন, তাহলে সে একা সবার ময়লা পরিষ্কার করতে পারবে না। সকলে মিলে পরিষ্কার রাখলে কম ময়লা হবে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পরিবার দেশের মতো। আপনারা এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে, তাই আপনাদের বুঝে-শুনে কাজ করতে হবে।