সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ভারতের উচিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৪:১১ অপরাহ্ন, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪:১১ অপরাহ্ন, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দুই দেশের প্রধান যখন কথা বলেন, তাদের মধ্যে যখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তখন অনেক সমস্যার সমাধানেরই সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ তো আছেই, রয়ে গেছে। ভারতের দিক থেকেও উচিত হবে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতসহ সব দেশ সফরে সরকার ইতিবাচক। এদিকে আগামী মাসে ব্রিকস সম্মেলনের ‘আউটরিচ সেশন’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিছক একটি সফর বাতিল হিসেবে দেখছে না দিল্লি।

আরও পড়ুন: শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ৮, তদন্তে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ: আমির খসরু

দেশটির কূটনৈতিক মহলের মতে, এখন ভারতের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দরজা খোলা রেখে এগোনোটাই ঢাকার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকে ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের একাংশের অভিমত, এই সুযোগে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হয়ে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, আমরা আগেই বলেছি, একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি যখন ভারতের মাটিতে বসে কথা বলেন, সেটা বাংলাদেশের জনগণ ভালোভাবে নেবে না, নেয় না। জুলাইয়ের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে জাগ্রত। রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। সুতরাং সেই জায়গা থেকে অবশ্যই আমাদের সংবেদনশীল হতে হবে।

আরও পড়ুন: পুলিশের ৫৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, তবে যেকোনো সময় যখন দুই দেশের সরকারপ্রধান বসবেন, তখন অবশ্যই অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। অনেক সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব এবং সেটাই আমরা আশা করি।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্ভাবনা তো সবসময়ই আছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবেও অনেক কর্মসূচি রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সামনে আবার পার্লামেন্ট অধিবেশন। সাংবিধানিক অনেক কাজও সামনে রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার ব্যস্ত আছে, প্রধানমন্ত্রীও ব্যস্ত আছেন। এর মধ্যেই যদি সবকিছু মেলে, অবশ্যই ভারত সফর হবে, জাপান সফর হবে—সব সফরই হবে। সেটা দেখা যাক।

শামা ওবায়েদ বলেন, সব দেশ সফরের ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক আছে। তবে এটা নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর সময়ের ওপর এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা কতটুকু এগোচ্ছে, সেটার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন, নাকি দ্বিপক্ষীয় সফরে—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্রিকস তো অনেক দেরি। এক মাসে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে।

কলকাতা প্রতিনিধি জানান, এদিকে ব্রিকস সম্মেলনের ‘আউটরিচ সেশন’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। কিন্তু বহুপাক্ষিক মঞ্চে যোগ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে নিছক একটি সফর বাতিল হিসেবে দেখছে না নয়াদিল্লি।

ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের একাংশের অভিমত, এই সুযোগে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হয়ে যেতে পারে। দিল্লি সূত্রের খবর, ব্রিকসের পাশাপাশি তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই বার্তা দেওয়া হয়েছে, দ্রুত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনে আগ্রহী নয়াদিল্লি।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হলে দুই দেশের সম্পর্কের একাধিক অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

ঢাকার আপত্তির জায়গাটি অবশ্য স্পষ্ট। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, প্রথম ভারত সফর শুধুমাত্র কোনো বহুপাক্ষিক সম্মেলনের পার্শ্ব-অনুষ্ঠান হিসেবে হলে তার রাজনৈতিক লাভ সীমিত। বিশেষ করে বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে শুধু করমর্দন, ছবি তোলা এবং আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে দেশে ফেরাকে বিএনপি নেতৃত্ব খুব বেশি লাভজনক মনে করছে না।

তবে দিল্লির মূল্যায়ন, বিষয়টি শুধু প্রতীকী সফর নয়। গঙ্গার পানিবণ্টন, চিকিৎসা ও পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সীমান্তসহ একাধিক ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে তা বাংলাদেশের জন্যও বাস্তব লাভের ক্ষেত্র খুলতে পারে।

এর মধ্যেই শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলনকে ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।

দিল্লির কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, মোদি-তারেক সরাসরি বৈঠক হলে বর্তমান অস্বস্তির জায়গাগুলো নিয়েও খোলামেলা আলোচনা সম্ভব। ঢাকা থেকে ফিরে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পরে তিনি বলেন, দুই নেতা যখন মুখোমুখি বসেন বা কথা বলেন, তখন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তার এই মন্তব্যকে কূটনৈতিক মহল তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে।

ফলে ব্রিকস মঞ্চে তারেক রহমান আদৌ আসবেন কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন—তিনি কি তার আগে বা পরে দিল্লিতে পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফরে আসবেন? ঢাকায় সেই প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এখনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। নয়াদিল্লির বার্তা অবশ্য পরিষ্কার—বহুপাক্ষিক মঞ্চে আসা না আসার সিদ্ধান্তের বাইরে ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দরজা খোলা রাখতে চায়। এখন সেই দরজা দিয়ে ঢাকাই কতটা এগিয়ে আসে, সেটাই দেখার।