ক্রীড়া ও স্বাস্থ্যখাতে ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ

Sanchoy Biswas
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ১০:৫১ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫১ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • স্বাস্থ্যখাতে চীনের প্রতি বিনিয়োগে আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
  • বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা চান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
  • অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের ক্রীড়া খাত আরও সমৃদ্ধ হবে : ইয়াও ওয়েন
  • চীনের অর্থায়নে দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা
  • চীনের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দলকে বাংলাদেশে প্রীতি ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ
  • বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় 
  • ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন শুধু রাজনীতি বা প্রথাগত বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নমুখী ক্ষেত্রগুলোতে তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বেইজিং ও ঢাকার মধ্যকার এই অংশীদারত্ব দুই দেশের জনগণের কল্যাণ, সুস্বাস্থ্য এবং তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বিকাশের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একদিকে চীনের আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে সমৃদ্ধ করছে, অন্যদিকে বিকেএসপিসহ বিভিন্ন ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে চীনের যৌথ উদ্যোগ দেশের অ্যাথলেটদের বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত করছে। পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার এই মেলবন্ধন ঢাকা-বেইজিং মৈত্রীকে আরও গভীর, প্রাণবন্ত এবং ভবিষ্যৎমুখী করে তুলছে।

ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ ও চীনের (ঢাকা-বেইজিং) পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রতি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও অর্থবহ করতে এবং সামাজিক উন্নয়নে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগ ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন এক যুগে উন্নীত করেছে, যা যৌথ ইশতেহারে ‘নতুন যুগে এক অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং খেলোয়াড় ও কোচদের মানোন্নয়নে চীন গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে।

আরও পড়ুন: ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয় অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বাধা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যেকার ক্রীড়া সম্পর্ক একটি দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে। খেলাধুলায় দুই দেশের সৌহার্দ্য সেই ১৯৭৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবেই চলছে। ফুটবল মাঠের উত্তেজনা থেকে শুরু করে টেবিল টেনিসের দ্রুতগতির লড়াই পর্যন্ত, প্রতিটি ইভেন্টই দুই দেশের বন্ধুত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও অ্যাথলেটদের বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে চীনের সাথে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই করেছে। চীনের উহান স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি বিকেএসপিতে একটি অত্যাধুনিক ‘রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’ (খেলোয়াড়দের চোট থেকে সেরে ওঠার কেন্দ্র) স্থাপনে সহায়তা করছে এবং বিকেএসপির শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ দিচ্ছে। বিনিময়ে বাংলাদেশে ক্রিকেটের উন্নয়নে তারা সহযোগিতা পাচ্ছে। বেইজিং স্পোর্টস ইউনিভার্সিটিতে একটি ডেডিকেটেড ‘বাংলাদেশ-চীন ক্রিকেট ইনস্টিটিউট হিসেবে দুই দেশের খেলোয়াড়, ট্রেইনার এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পারস্পরিক বিনিময়ের জন্য কাজ করছে। এ ছাড়া সার্ফিং, শুটিং, ভলিবল এবং টেবিল টেনিসের মতো খেলাগুলোতে খেলোয়াড়দের দক্ষতা বাড়াতে চীনা কোচদের বাংলাদেশে আনা এবং আধুনিক ক্রীড়া প্রযুক্তি শেয়ার করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। 

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন শুধু অনুদান বা ওষুধ আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের কাছে ২০টি বড় হাসপাতাল স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিশেষ প্রশিক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল হেলথ ফোরাম সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী চীনের কাছে স্মার্ট স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের ওষুধ শিল্পের বাজার আরও বড় করতে এবং যৌথভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনে চীনা বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার বিষয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে চীনের হাইনান জেনারেল পিপলস হসপিটালে বিশেষ ‘গ্রিন মেডিকেল চ্যানেল’ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় ও ভিসা প্রসেসিং সহজ করার বিষয়ে বেইজিং আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারিসহ অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে চীন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করছে।  

আরও পড়ুন: শিক্ষায় প্রযুক্তির ছোঁয়া, ৭ লাখ শিক্ষককে ট্যাব দেবে সরকার

বাংলাদেশ ও চীনের সুদৃঢ় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে চায় বাংলাদেশ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর চীনের হাইনান প্রদেশের বোআও ল্যেছেং আন্তর্জাতিক মেডিকেল ট্যুরিজম পাইলট জোনে হাইনান প্রদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন মন্ত্রী। বৈঠকে হাইনান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির কমিটির সম্পাদক ফেং ফেই ও ভাইস গভর্নর শিয়ে জিং উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০টি বড় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় চীনের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। বৈঠকে বাংলাদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, চিকিৎসক বিনিময় ও প্রশিক্ষণ, উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ প্রতিরোধ এবং ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিনে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি স্তন ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি হাম, ডেঙ্গু ও থ্যালাসেমিয়ার মতো সংক্রামক ও অন্যান্য রোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা করা হয়।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গ্লাভস, মাস্ক ও ব্লাড ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী উৎপাদনে হাইনানভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করতে পারে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।হাইনানের কর্মকর্তারা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সফর, চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। উভয় পক্ষই স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) চীনের একাধিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চুক্তি করেছে। এই চুক্তির অধীনে চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট প্রশিক্ষণার্থী, খেলোয়াড় এবং ট্রেইনাররা নিয়মিত বাংলাদেশে এসে ক্রিকেটীয় দীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এছাড়া বিকেএসপির কোচেরাও চীনে গিয়ে ক্রিকেট শেখাচ্ছেন। চীনের ক্রিকেটের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড় করানো এবং খেলোয়াড়দের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ সরাসরি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেট যুক্ত হওয়ার পর চীন তাদের ক্রিকেট স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও ক্রিকেটীয় সামর্থ্যের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করছে। চীনের নারী ও পুরুষ জাতীয় ক্রিকেট দলের ভিত্তি ও খেলোয়াড়দের কারিগরি দক্ষতা তৈরিতে বাংলাদেশি কোচেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের সাবেক আন্তর্জাতিক নারী ক্রিকেটার ফাতেমা তুজ জোহরা প্রায় দুই বছর চীনের নারী জাতীয় ক্রিকেট দলের হাই-পারফরম্যান্স কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চীনের অলিম্পিক ক্রিকেট স্বপ্নের পেছনে বড় অবদান রেখেছেন। সম্প্রতি চীন সরকার বাংলাদেশ থেকে আরও পেশাদার ক্রিকেট কোচ নেওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

চীনের ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটিতে “বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট সেন্টার” স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ কারিগরি এবং কৌশলগত সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি বেইজিং স্পোর্টস ইউনিভার্সিটির সাথে যৌথ উদ্যোগে ক্রিকেটের উন্নয়নে সহায়তা করছে বিকেএসপি। ক্রিকেটের বাইরে চীনের ঘরোয়া ক্লাব ও একাডেমিগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ জন পেশাদার টেনিস কোচ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। চীনের মাটিতে টেনিসের জনপ্রিয়তা বাড়ার পর তারা বাংলাদেশি প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে তাদের তরুণ টেনিস খেলোয়াড়দের গ্রুম বা তৈরি করছে।

চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ক কেবল খেলোয়াড়দের আদান-প্রদান বা মাঠের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে চীনের উল্লেখযোগ্য অবদান। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তোলার পেছনে চীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন সময়ে চীন বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কারে কারিগরি সহায়তা এবং আর্থিক অনুদান দিয়ে আসছে। এটি শুধু নতুন স্থাপনা তৈরি করেনি, বরং বিদ্যমান কাঠামোকে আধুনিকীকরণ করে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়াম আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনের প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং নির্মাণ সহায়তার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধরনের প্রকল্পগুলো কেবল খেলার মান বাড়ায় না, বরং বৃহত্তর সংখ্যক দর্শকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা নিশ্চিত করে। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, অত্যাধুনিক ফ্লাডলাইট স্থাপন, উন্নত ড্রেসিং রুম এবং প্রশিক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করায় চীনা প্রকৌশলী ও স্থপতিদের দক্ষতা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আরও বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। 

বাংলাদেশের উদীয়মান স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রির আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কারিগরি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছে সরকার। চলতি বছরের ৩১ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের দফতরে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই প্রস্তাব দেন। সাক্ষাৎকালে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী চীনের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দলকে বাংলাদেশে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। তিনি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত স্পোর্টস ইনস্টিটিউটে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগের অনুরোধ করেন। বিশেষ করে ভলিবল, আর্চারি ও শুটিংয়ের মতো ইভেন্টগুলোতে দক্ষ চীনা কোচ এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি সব ধরনের খেলাধুলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ক্রীড়া ভাতা এবং ডিজিটাল ক্রীড়া কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশের ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়নে চীনের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রতিমন্ত্রীর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশের ডিজিটাল ক্রীড়া উদ্যোগ ও খেলোয়াড়দের মাসিক ভাতার কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং স্পোর্টস ইনস্টিটিউটে বিনিয়োগের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করেন। চীনের জাতীয় ফুটবল দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, নিয়মিত ক্রীড়া সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের ক্রীড়া খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ই-স্পোর্টস এবং ফিটনেস টেকনোলজিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ক্ষেত্রগুলোতেও বাংলাদেশ চীনের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। উদাহরণস্বরূপ, অত্যাধুনিক ফিটনেস ট্র্যাকার, পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম এবং ভিডিও অ্যানালাইসিস টুলস ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের দক্ষতা আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ই-স্পোর্টস যেহেতু বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করছে, চীন এই ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাথে ভাগ করে নিতে পারে, যা দেশের যুবকদের জন্য নতুন ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি, চীনের ‘ স্পোর্টস সায়েন্স ইউনিভার্সিটি’-এর সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একটি সহযোগিতা প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। এই উদ্যোগগুলো শুধু খেলার মান বাড়াবে না বরং শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনায়ও চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের অবদান ও সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং চিকিৎসকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ অন্যতম।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে চীন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীনের অর্থায়নে দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি হাসপাতাল নির্মিত হবে। এর মধ্যে ১ হাজার শয্যার ১৮টি সাধারণ হাসপাতাল এবং নারী ও শিশুদের জন্য ১ হাজার ৫০০ শয্যার দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকবে। পাশাপাশি ১০০টি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ও চারটি হেলিকপ্টার দেওয়ারও প্রস্তাব রয়েছে। পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। হাসপাতাল নির্মাণে জমি দেবে বাংলাদেশ, আর নির্মাণ ব্যয় বহন করবে চীন। হাসপাতালগুলো বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ জেলা, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও খুলনা অঞ্চলে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ট্রমা, স্নায়ুরোগ, হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসার ও লিভারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা দেশে আরও সহজলভ্য হবে। এতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ও হাসপাতাল খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের অন্যতম বড় অংশীদার চীন। করোনা মহামারির সময়ও চীনের টিকা দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এবার হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে সরাসরি চিকিৎসাসেবা খাতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ শুধু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য জায়গা দেবে। বাকি সবকিছু করবে চীন। চীনের নির্মিত হাসপাতালের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী অত্যন্ত উন্নত। হাসপাতালগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার পাবে উত্তরবঙ্গ ও খুলনা অঞ্চল। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলও এর আওতায় আসবে। হাসপাতালগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হবে, যাতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতির জন্য একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। উন্নত চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যায়। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশে যদি একই মানের সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশের চিকিৎসা খাতেও আমূল পরিবর্তন আসবে। স্বাস্থ্যখাতে চীনের বিভিন্ন কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই চলমান। দেশটির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর অন্যতম হলো স্বাস্থ্যখাত। চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। বদলে যাবে সারাদেশের চিকিৎসার মান। একই সঙ্গে আরও বেশি মানুষ উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবে।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতির আকার বড় করতে চায়। আর সে জন্য চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন এবং নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। দেশে আধুনিক চিকিৎসার ঘাটতি, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং আস্থার সংকটের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায়। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। বিদেশমুখী চিকিৎসা কমানো গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে এবং অর্থনীতির আকার বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।