বহুমুখী চ্যালেঞ্জে সরকার

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ন, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:০৮ অপরাহ্ন, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ এ আই নির্মিত
ছবিঃ এ আই নির্মিত
  • স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি
  • দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দূর করতে সরকারকে সময় দিতে হবে
  • ব্যাংক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অর্থনীতি নদীতে পড়ার শঙ্কা: মাহবুব উল্লাহ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত ও খেলাপি ঋণ, রাজস্ব আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, প্রশাসনে জবাবদিহি, সহিংসতা ও উগ্রবাদ, নারী ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তি ও এলডিসি উত্তরণসহ বহুমুখী সংকট উত্তরণে নিরলসভাবে কাজ করছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীণ সরকার। তবে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। অধিকাংশ ব্যাংক এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুবিধা ধরে রাখা। একইভাবে দেশের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও কম রাজস্ব আহরণ (কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা) এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সরকারকে দেনার ফাঁদে ফেলছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, লাগামহীন খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম দূর করা একটি বড় পরীক্ষা। এরআগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রভিশনাল জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ৬.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো (যেমন আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক) বিনিয়োগ খরা ও মন্থরগতির কারণে তা নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং তরুণদের বড় একটি অংশ পড়াশোনা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা বড় সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট। দেশে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং শিল্প ও উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এ খাতের ভর্তুকি ও ব্যয় সামাল দেওয়া।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে তদন্তে কমিটি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কার্যকর হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে এই সময় বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত একটায় শুরু হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্ল্যানারি মিটিংয়ে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। তবে বাড়তি তিন বছর পেলেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দূর হয়ে যাবে না। বরং এই সময়ের মধ্যে রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে। তবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হচ্ছে-রফতানি খাতের সক্ষমতা ধরে রাখা। দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু পরিবর্তন হতে পারে, যা রফতানিকারকদের ব্যয় ও প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে কার্যকর বাণিজ্য কৌশল প্রয়োজন। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে কোন বাজারে কী ধরনের শুল্ক সুবিধা থাকবে, কোন নিয়মে পণ্য রফতানি করতে হবে এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে কীভাবে সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে—এসব বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি জরুরি।

এ জন্য শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় খাতের রফতানি বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, জমি প্রাপ্তি, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত প্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসা শুরুর খরচ ও সময় কমানোর পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে। অর্থনীতির টেকসই রূপান্তরের জন্য ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানোও জরুরি। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করতে পারে। বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে, বিনিয়োগ ব্যয় বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে। এ জন্য ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং করপোরেট সুশাসন জোরদার করতে হবে।

আরও পড়ুন: ‘তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন, আমি পালিয়ে আসি’ — পিবিআইকে দ্বীপ

পাশাপাশি আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়িয়ে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। উন্নয়ন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিল্পায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু করের আওতা সীমিত থাকা, কর ফাঁকি এবং কর প্রশাসনের দুর্বলতা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। করব্যবস্থা সহজ করা, করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতাদের সেবা উন্নত করার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সীমিত সম্পদ থেকে বেশি উন্নয়ন ফল পাওয়া যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বাজারে সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় রাখা প্রয়োজন।

এলডিসি উত্তরণ টেকসই করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরি সৃষ্টি, নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। শুধু শ্রমনির্ভর উৎপাদন দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সহজ হবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রসার কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সুশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে। এ বিষয়ে কথা হয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন এর সঙ্গে। তিনি বলেন,এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে একে স্বস্তির অবকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই অতিরিক্ত সময়কে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার প্রস্তুতি জোরদারে কাজে লাগাতে হবে।

এ জন্য প্রথমেই একটি বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়ন করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্বে থাকবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে, জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে বর্ধিত প্রস্তুতিকালে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে। উত্তরণ প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সিদ্ধান্তে আরও বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ হতে হবে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়। উত্তরণের কারণে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে না। বরং এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতির দুর্বলতা কতটা কাটানো গেলো, উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়লো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কতটা তৈরি হলো—তার ওপরই নির্ভর করবে ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা কতটা টেকসই হবে।