‘লাখ টাকা ইনকাম’-এর ফাঁদ: এডটেক ইন্ডাস্ট্রির ‘শুভংকরের ফাঁকি’

Any Akter
পারভেজ আহমেদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: ৪:০১ অপরাহ্ন, ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১০:১৭ অপরাহ্ন, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

অনলাইন ক্লাসের মোহ এবং স্কিলহীন গ্র্যাজুয়েট তৈরির কারখানা—নেপথ্যে আসলে কী চলছে?

ঢাকার কোনো এক চিপার টং দোকানে চা খেতে খেতে পাশের টেবিলের আড্ডাটা শুনুন। টপিক একটাই—"দোস্ত, পাইথনের ওই কোর্সটা কিনছি, অফারে পাইলাম। এইবার চাকরি কনফার্ম!"

আরও পড়ুন: চ্যাটজিপিটিকে ছাড়িয়ে মেটার নতুন এআই অ্যাপ

ছেলেটা হয়তো জানেও না, সে আসলে স্কিল কিনছে না, কিনছে একটা মিথ্যে আশা। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনলাইন এডুকেশন বা "EdTech" প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের একটা বিশাল ভুলের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমরা মনে করছি, ভিডিও দেখলেই ডেভেলপার হওয়া যায়, আর পিডিএফ সার্টিফিকেট পকেটে থাকলেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আমাদের জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে রাখবে।

"কিন্তু স্বপ্নের বেলুনটা যখন ফাটে, তখন শব্দটা বেশ জোরেই হয়।"

আরও পড়ুন: হঠাৎ বন্ধের পর আবার স্বাভাবিক ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম, জানুন কী হয়েছিল?

সার্টিফিকেটের ব্যবসা নাকি স্কিলের অভাব?

আমাদের দেশে এখন "কোর্স সেলিং" একটা ট্রেন্ড। ফেসবুকে স্ক্রল করলেই দেখবেন—"শূন্য থেকে হিরো," "এক মাসেই ফ্রিল্যান্সিং শিখুন," বা "ঘরে বসেই লাখ টাকা ইনকাম"। শুনতে খুব চিজি লাগলেও হাজার হাজার বেকার যুবক এই ফাঁদেই পা দিচ্ছে।

সমস্যাটা প্ল্যাটফর্মগুলোর একার না, সমস্যা আমাদের মেন্টালিটিতেও। আমরা শিখতে চাই না, আমরা শুধু "পাস" করতে চাই। ঢাকার কর্পোরেট অফিসগুলোতে এইচআর ম্যানেজারদের সাথে কথা বলে দেখুন। তারা বলবে, "সিভি তো পাই হাজার হাজার, সব সিভিতেই লেখা 'অ্যাডভান্সড এক্সেল' বা 'ফুল স্ট্যাক ডেভেলপার'। কিন্তু ইন্টারভিউ বোর্ডে যখন একটা রিয়েল-লাইফ প্রবলেম সলভ করতে দেই, তখন ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায়।"

মানেটা সিম্পল—আমরা ভিডিও কনজিউমার হচ্ছি, প্রবলেম সলভার না।

"ভাইয়া" কালচার এবং ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং

ঢাকার টেক ইন্ডাস্ট্রিতে এখন একটা অদ্ভুত "ভাইয়া" কালচার চলছে। কোডিং বা মার্কেটিং শেখানোর চেয়ে, নিজেকে ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করানোটা বেশি জরুরি হয়ে গেছে। যিনি কোর্সটা করাচ্ছেন, তার নিজের কোনো প্রাকটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এক্সপেরিয়েন্স আছে কি না, সেটা কেউ যাচাই করি না। তার ফেসবুক ফলোয়ার ১ লাখ, মানেই তিনি সেরা মেন্টর—এই লজিকটা আমাদের ডুবিয়ে দিচ্ছে।

সত্যিকারের লার্নিং কখনো গ্ল্যামারাস হয় না। এটা বোরিং, এটা পেইনফুল। একটা কোড তিন দিন ধরে রান করছে না, বা একটা ক্যাম্পেইন ফেইল করেছে—এই ফেইলিউর থেকে শেখানোটাই আসল মেন্টরশিপ। কিন্তু আমাদের এডটেকগুলো দেখাচ্ছে শুধু চকচকে সাকসেস স্টোরি।

তাহলে কি সব ভুয়া?

না, একদমই না। বাংলাদেশে কিছু জেনুইন প্ল্যাটফর্মও আছে যারা আসলেই স্কিল তৈরি করছে। তারা আপনাকে শুধু ভিডিও দেখিয়ে ছেড়ে দেয় না। তারা অ্যাসাইনমেন্ট করায়, প্রজেক্ট করায়, এবং যতক্ষণ না আপনি কাজটা পারছেন, ততক্ষণ "প্যারা" দেয়।

কিন্তু ভালো আর মন্দের পার্থক্যটা বুঝবেন কীভাবে? সিম্পল একটা লিটমাস টেস্ট আছে:

  • যে কোর্স বলে "১০০% চাকরির গ্যারান্টি"—সেটা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকুন।
  • যে কোর্স বলে "তোমাকে খাটতে হবে, আমরা শুধু গাইড করব"—সেটাই আসল ডিল।

ফিউচার কী?

আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এখন শিফট হচ্ছে। এখন আর "আমি ডিজিটাল মার্কেটার" বলে চাকরি পাওয়া যাবে না। বলতে হবে, "আমি এই কোম্পানির সেলস ২০% বাড়িয়েছি এই ফানেল ব্যবহার করে।"

সার্টিফিকেট হলো কাগজের টুকরো, আর স্কিল হলো কারেন্সি। ঢাকার জ্যাম ঠেলে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে যদি শুধু ফোল্ডার ভর্তি সার্টিফিকেট নিয়ে যান, তবে খালি হাতেই ফিরতে হবে। আর যদি ল্যাপটপ খুলে গিটহাবের (GitHub) প্রজেক্ট বা নিজের পোর্টফোলিও দেখাতে পারেন—বস, চাকরিটা আপনারই।

আমাদের এডটেক ইন্ডাস্ট্রিকে এখন "কোর্স বেচা" বন্ধ করে "ক্যারিয়ার গড়া"র দিকে ফোকাস করতে হবে। আর আমাদেরও বুঝতে হবে—শর্টকাটে ঢাকা যাওয়া যায়, কিন্তু শর্টকাটে সাকসেস পাওয়া যায় না।

শেষকথা - কোর্স কেনার আগে: ৫টি বিষয় চেক না করলেই ধরা!

কষ্টের টাকা কোনো কোর্সে ইনভেস্ট করার আগে এই ৫টি প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নিন। যদি উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তবে "বিকাশ" করার আগে দুবার ভাবুন।

১. মেন্টর আসলে কী করেন? যিনি শেখাচ্ছেন, তিনি কি বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন? নাকি তিনি শুধুই "ফুল-টাইম ট্রেইনার"? মেন্টরের LinkedIn প্রোফাইল চেক করুন। যদি দেখেন তিনি গত ৫ বছরে কোনো রিয়েল প্রজেক্ট বা কোম্পানিতে কাজ করেননি, তবে তার নলেজ আউটডেটেড হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

২. "চাকরি কনফার্ম" গ্যারান্টি দিচ্ছে কি? সোজা কথা—পৃথিবীর কোনো কোর্স চাকরির গ্যারান্টি দিতে পারে না; চাকরি দেয় আপনার স্কিল। যদি কেউ বলে "কোর্স শেষেই ১০০% চাকরি"—বুঝে নেবেন এটা একটা মার্কেটিং গিমিক বা ফাঁদ। ভালো মেন্টররা বলেন, "আমরা তোমাকে যোগ্য বানাবো, লড়তে হবে তোমাকেই।"

৩. কারিকুলামে "হ্যান্ডস-অন" প্রজেক্ট আছে তো? শুধু ৩০ ঘণ্টার ভিডিও দেখে ডেভেলপার বা মার্কেটার হওয়া সম্ভব না। চেক করুন কোর্সে Real-life Projects বা ক্যাপস্টোন প্রজেক্ট আছে কি না। আপনাকে কি শুধুই থিওরি শেখানো হবে, নাকি কোনো প্রজেক্ট পোর্টফোলিওতে অ্যাড করার সুযোগ পাবেন?

৪. আটকে গেলে হেল্প করবে কে? ভিডিও দেখতে দেখতে কোথাও আটকে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তখন সাপোর্ট দেবে কে? তাদের কি কোনো Discord সার্ভার, স্ল্যাক গ্রুপ বা ডেডিকেটেড সাপোর্ট টিম আছে? নাকি কোর্স বেচার পর তাদের আর কোনো খবর পাওয়া যায় না? সাপোর্ট সিস্টেম না থাকলে সেই কোর্স ইউটিউব ভিডিওর চেয়ে ভালো কিছু না।

৫. অ্যালামনাইদের সাথে কথা বলেছেন? ওয়েবসাইটের চকচকে রিভিউ বা টেস্টিমোনিয়াল বিশ্বাস করবেন না। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে আগে যারা কোর্স করেছেন, ফেসবুকে বা লিংকডিনে তাদের খুঁজে বের করুন এবং ডিরেক্ট মেসেজ দিন। জিজ্ঞেস করুন— এই কোর্সটা করে আসলে কি কোনো লাভ হয়েছে?" রিয়েল ফিডব্যাক সেখানেই পাবেন।


লেখক: পারভেজ আহমেদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা