সাভারে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা কাগজে-কলমে, ইটভাটার বিষে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

Sadek Ali
জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, আশুলিয়া
প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ন, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৭ অপরাহ্ন, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বায়ু দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা। ইটভাটার কালো ধোয়ার প্রভাবে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। 

ঢাকার বায়ু দূষনের মাত্রা ভয়াবহ ভাবে বেড়ে যাওয়ায় গেল বছর থেকে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী সাভার উপজেলাকে ঘোষণা করা হয় 'ডিগ্রেডেড এয়ারশেড'। এর পর থেকে এই অঞ্চলের ইটভাটা বন্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে প্রশাসন। তবে অভিযান পরবর্তী সময়ে ইটভাটাগুলোর বেশিরভাগই পুনরায় শুরু করে কার্যক্রম।যা সরকারের পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম ও নজরদারিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আরও পড়ুন: দর্শনার কুন্দিপুরে গৃহবধূ ও যুবককে চুল কেটে জুতার মালা পরিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাভারের বার্ষিক বায়ুমান জাতীয়ভাবে নির্ধারিত মানের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, এখানকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। অবৈধ ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর কণিকা প্রতিদিন বায়ুর মান আরও খারাপ করছে, যা ফুসফুসের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গত ৫ নভেম্বর আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে বেশ কয়েকটি ইটভাটার চুল্লি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সেখানে নতুন করে চুল্লি বা কিলন নির্মাণ করে আবার ইট উৎপাদন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন,ভাটা ভাঙার পর ভেবেছিলাম সমস্যা শেষ। কিন্তু এখন দেখি আবার চালু। কীভাবে, কার অনুমতিতে চালু হলো—তার কোনো জবাব নেই।

আরও পড়ুন: কাপাসিয়ায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শাওন বলেন, দেশে পরিবেশ সংরক্ষণে একটি আইন থাকলেও সেখানে সাধারণ মানুষের লোকাস স্ট্যান্ডি নেই। অর্থাৎ পরিবেশগত ক্ষতির ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাধারণ নাগরিকের আদালতে মামলা করার স্পষ্ট অধিকার নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইনের সংশোধন করেছে। তাই পরিবেশ আইনেও প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা জরুরি। পরিবেশের ক্ষতির কারণে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সে বিষয়ে মামলা করার আইনগত অধিকার সাধারণ মানুষের থাকা উচিত। সরকারের কাছে তিনি এই অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ইটভাটার আগুনের তাপ ও ছাইয়ের কারণে আশপাশের ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের ফলে সামাজিক বনও উজাড় হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাজিব রায়হান আক্ষেপ করে বলেন,ইটভাটার ধোঁয়ায় আমাদের এলাকায় নিঃশ্বাস নেওয়াই কষ্টকর। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো রোগ বাড়ছে। ফসলি জমি ও বন—সবই ধ্বংসের মুখে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ান-উল-ইসলাম বলেন,আমরা নিয়মিত নজরদারিতে রাখছি। অনেক ইটভাটা মেকানিক্যাল না হয়ে ম্যানুয়ালি পরিচালিত হওয়ায় তারা দ্রুত পুনরায় চালু করার সুযোগ পায়। যারা আবার চিমনি নির্মাণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে এবার অতিরিক্ত মামলা দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সরাসরি গ্রেপ্তারের মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাভার উপজেলায় প্রায় ১০৭টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র দুটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং স্থায়ীভাবে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিয়মিত নজরদারি জরুরি। অন্যথায় সাভারের এই বিষাক্ত বাতাস রাজধানী ঢাকার বায়ুমানকেও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক সংকটে ফেলবে।