জিসিসির প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে জাহাঙ্গীরের সহযোগীকে ফেরানোর চেষ্টায় তোলপাড়

Sanchoy Biswas
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ন, ১২ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৭ অপরাহ্ন, ১২ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে দুদকের মামলার আসামি সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রধান প্রকৌশলী আকবর হোসেনকে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ উঠেছে। এ লক্ষ্যে প্রশাসক স্বাক্ষরকরা একটি ডিও লেটার স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর বরাবরে জমা হলেও সেটি চিঠির স্বাক্ষর প্রশাসকের নয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জিসিসির স্মারক শাখার একটি সহকারীকে শোকজ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: সোহেল হাসান।

আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জে হ্যাকার চক্রকে ধরার অভিযানে হামলা, ফাঁকা গুলি, এক নারী গ্রেফতার

তিনি বলেন, প্রশাসক মহোদয় সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার জানামতে এ ধরনের কোনো চিঠি দেননি। চিঠির স্বাক্ষরটি তার স্বাক্ষরের সঙ্গে কোনো মিল নেই। তবে চিঠির স্মারক নম্বরটি সিটি করপোরেশনের।

তিনি আরও বলেন, ভুয়া চিঠিতে স্মারক নম্বর দেওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট শাখা সহকারী আশরাফকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশরাফ আমাদের মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, প্রকৌশলী আকবর তাকে একপ্রকার জোরপূর্বক কাজটি করিয়েছে।

আরও পড়ুন: নাসিরনগর সদরে ফ্ল্যাট বাসায় দুঃসাহসিক চুরি

গত ১ মার্চ তারিখের স্মারকে জিসিসি প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার স্বাক্ষরিত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বরাবরে লেখা চিঠির বিষয়ে বলা হয়েছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (অঃদাঃ) মোঃ আকবর হোসেনকে প্রধান প্রকৌশলী (চুক্তিভিত্তিক) পদে নিয়োগ প্রদান প্রসঙ্গে।

এতে বলা হয়েছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বে) মো: আকবর হোসেনকে গত ২৩ সালের ১লা নভেম্বর হতে ২৪ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পিআরএল ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল। এবং গত ৩০/১১/২৪ তারিখে অবসর গ্রহণ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে ক্লিন, গ্রীন, সাসটেইনেবল এবং বসবাসের উপযোগী সিটি করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। উল্লিখিত কাজগুলো দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কোনো ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী নেই। দীর্ঘ প্রায় এক বছরের অধিককাল ধরে ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী পদ শূন্য।

এতে আরও বলা হয়েছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে দীর্ঘদিন যাবত মোঃ আকবর হোসেন জড়িত ছিলেন। এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা শীর্ষক প্রকল্প, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি মেগা প্রকল্পগুলোও তিনি দীর্ঘদিন যাবত নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের নিমিত্তে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের স্বার্থে জনাব মোঃ আকবর হোসেনকে নিয়োগ প্রদান প্রয়োজন।

চিঠির শেষ অংশে জনস্বার্থে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের লক্ষ্যে মোঃ আকবর হোসেনকে প্রধান প্রকৌশলী পদে ২ (দুই) বছরের জন্য নিয়োগ প্রদানের অনুমতি প্রদান করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।

এ চিঠির বিষয়টি প্রকাশ হলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ চাকরি জীবনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন আকবর হোসেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপসহ নানা অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখায় প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে দীর্ঘ চাকরি জীবনে লুটপাটের ছোট-বড় সব খাতেই হাত পড়েছে আকবর হোসেনের। বাদ যায়নি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকাও। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন, নিয়োগ, বদলি বাণিজ্যসহ ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেন সেবাদানকারী এ প্রতিষ্ঠানকে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলমের সেকেন্ড ইন কমান্ড লাদেন মনির, আশরাফুল ইসলাম রানার ও কিছু আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে টেন্ডার ফাইল নিয়ন্ত্রণ ও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এক কথায় সিটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জাহাঙ্গীর আলমের খুব আস্থাভাজন ছিলেন আকবর হোসেন।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও পিআরএল স্থগিত রেখে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান আকবর হোসেন। তবে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগের সরকারের আমলে দেওয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়।

সূত্রের অভিযোগ, জিসিসির ৭ হাজার ৫শ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে এক কর্মকর্তাসহ সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সকল দুর্নীতির সহযোগী ছিলেন আকবর। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা আকবর হোসেন জাহাঙ্গীরের সময়ে তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতেন। তিনি ছিলেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা। দুর্নীতিতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। জাহাঙ্গীরের আমলে সকল অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এই আকবর হোসেন কাউকেই পরোয়া করতেন না। তার সহযোগিতা ছাড়া জাহাঙ্গীরের একার পক্ষে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি করা সম্ভব ছিল না। জাহাঙ্গীরের বিশ্বস্ত থাকার কারণে পিআরএলে থাকার সময় তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

একাধিক সূত্র জানায়, চলতি বছরে জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গাজীপুর সিটিকে গ্রিন ও ক্লিন সিটি হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিসিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অবসরের পরও যদি একই ব্যক্তি আবার দায়িত্ব পান, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নেতিবাচক বার্তা যাবে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এ বিষয়ে জিসিসির প্রশাসক ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে কোনো চিঠি লিখিনি। চিঠির স্বাক্ষর আমার নয়। আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য কোনো মহল এ কাজটি করে থাকতে পারে।