নির্বাচনী ব্যয়ে জমা না দেওয়ায় ২১ জন এমপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়াচ্ছে ইসি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২১ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এখনো নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা না দেওয়ায় নতুন করে আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও একাধিক দফা সময় বাড়িয়েও এসব প্রার্থীর কাছ থেকে হিসাব পায়নি সংস্থাটি। এরপরও আরও এক দফা সময় বাড়িয়ে আগামী ১৪ জুন পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছে ইসি।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা না দেওয়া শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি নির্বাচনী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থের উৎস নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আইন প্রয়োগ সক্ষমতা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচন ভবন ঘিরে অবৈধ কম্পিউটার-ফটোকপি দোকান গুঁড়িয়ে দিল ইসি
ইসি সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার এ সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়েছে। ইসির উপসচিব মো. মনির হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, নির্ধারিত সময় ও পরবর্তী বর্ধিত সময়ের মধ্যেও যেসব প্রার্থী নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করেননি, তাদের জন্য শেষবারের মতো ১৪ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
যেসব প্রার্থী এখনো হিসাব দেয়নি:
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান সিইসির
ইসির তালিকা অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব জমা না দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—নীলফামারী-৪ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মির্জা মো. শওকত আকবর, লালমনিরহাট-১ আসনে বাংলাদেশ জাসদের হাবিব মো. ফারুক, রংপুর-২ আসনে জেএসডির মো. আজিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সরকার মো. নুরে এরশাদ সিদ্দিকী।
এ ছাড়া চাপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের নবাব মো. শামসুল হোদা ও মুক্তিজোটের মো. আব্দুল হালিম, নাটোর-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, ভোলা-১ আসনে গণঅধিকার পরিষদের মো. আইনুর রহমান (জুয়েল) মিয়া, ভোলা-২ আসনে স্বতন্ত্র মহিবুল্লাহ খোকন ও আমজনতার দলের মো. আলা উদ্দিন, ভোলা-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের মো. আবু তৈয়ব ও জাতীয় পার্টির মো. কামাল উদ্দিন, ভোলা-৪ আসনে এনডিএমের আবুল কালাম এবং আমজনতার দলের মো. জালাল উদ্দীন রুমী রয়েছেন।
তালিকায় আরও আছেন ময়মনসিংহ-৫ আসনে এবি পার্টির মো. রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক মো. জসিম উদ্দিন, ঢাকা-১৪ আসনে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুশতাক আহমদ, চাঁদপুর-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মো. এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১২ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ফরিদ এল আলম এবং বান্দরবান আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দীন।
আইনে কী আছে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। এতে নির্বাচনী তহবিলের উৎস, প্রচারণা ব্যয়, পরিবহন, সভা-সমাবেশ, পোস্টার, কর্মী ব্যয় ও অন্যান্য খরচের বিবরণ উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধান মূলত নির্বাচনে কালো টাকা, অঘোষিত অর্থের ব্যবহার এবং করপোরেট বা গোষ্ঠীগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয়ের হিসাব আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায় এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে জমা দেওয়া হিসাবের বড় ধরনের অমিল থাকে।
বারবার সময় বাড়ানোয় প্রশ্ন:
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরদিন গেজেট প্রকাশের পর আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি ইসি চিঠি দিয়ে ১৫ মার্চের মধ্যে হিসাব জমা দিতে প্রার্থীদের অনুরোধ করে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ৯২ জন প্রার্থী ব্যয়ের হিসাব জমা না দেওয়ায় কমিশন সময় বাড়িয়ে ৬ মে পর্যন্ত সুযোগ দেয়। এরপরও ২১ জন প্রার্থী হিসাব না দেওয়ায় আবারও সময় বাড়ানো হয়েছে।
একের পর এক সময় বাড়ানো হলে আইনের বাধ্যবাধকতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাকে গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে ।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় পরীক্ষা:
নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব কেবল কাগুজে প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অন্যতম ভিত্তি। কোনো প্রার্থী কত অর্থ ব্যয় করেছেন, সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং আইনসিদ্ধ সীমা অতিক্রম হয়েছে কি না—এসব যাচাইয়ের মাধ্যমই হচ্ছে ব্যয়ের রিটার্ন।
তাদের মতে, নির্বাচন কমিশন যদি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বাচনী সংস্কার ও সুশাসনের প্রশ্নে কমিশনের অবস্থান আরও দুর্বল হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।





