স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে ইসি রহমানেল মাছউদ

দেশজুড়ে প্রার্থীরা মাঠে নেমেছেন, বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ন, ২৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:৩৮ অপরাহ্ন, ২৪ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না এলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজস্ব প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা, পোস্টার, দোয়া প্রার্থনা এবং রাজনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে নির্বাচন নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিশূন্য স্থানীয় সরকার কাঠামো টেকসই হতে পারে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

বুধবার ( ২৪ জুন)  নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বলেন, কমিশনের দায়িত্ব হলো নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা তৈরি রাখা, আর নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সামনের রোববার কমিশন সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন বলে জানিয়েছেন রহমানেল মাছউদ।  

আরও পড়ুন: স্থানীয় ভোটে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনগত যোগ্যতাই মুখ্য: ইসি সচিব

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বার্তা কমিশনের কাছে আসেনি। তবে কমিশন নিজস্ব উদ্যোগে মাঠপর্যায়ের অবকাঠামো, কেন্দ্র, জনবল, আইনশৃঙ্খলা, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করছে।

রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা সরকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছি, সরকারও আমাদের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করছে। নির্বাচন হলে কী কী লাগবে, কোথায় কী ঘাটতি আছে, কত দিনের মধ্যে তা পূরণ করা সম্ভব—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে কাজ করতে বলা হয়েছে।”

আরও পড়ুন: নির্বাচনী দায়িত্বে প্রাণহানি হলে ১০ লাখ টাকা অনুদান, ইসির নতুন সুরক্ষা নীতিমালা

‘দেশজুড়ে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে গেছে’: 

নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মাঠপর্যায়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দোয়া চেয়ে পোস্টার টানাচ্ছেন, প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, “মানিকগঞ্জে গিয়ে দেখেছি কেউ ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী হওয়ার জন্য দোয়া চাচ্ছেন। ঢাকাতেও একই চিত্র। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, সবাই নির্বাচন হবে ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।”

তার মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য ইতিবাচক নয়। কারণ স্থানীয় সরকারই জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক ও সেবামূলক স্তর।

অক্টোবর-নভেম্বরকে ঘিরে আশাবাদ: 

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে রহমানেল মাছউদ বলেন, কমিশন সম্ভাব্য সময়সূচি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমি আশাবাদী। অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে পরিস্থিতি, প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।”

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের জন্য কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তুতির সময় খুব বেশি নয়। অতীতে কমিশন সংসদীয় কমিটির প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিল, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা রয়েছে।

সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা: 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার বলেন, এটি পরিস্থিতিনির্ভর বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশন ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রথমে পুলিশ, পরে প্রয়োজন হলে বিজিবি এবং আরও প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য ডাকা যেতে পারে। তবে সবক্ষেত্রে আইন ও বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তার ভাষায়, “যেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য দিয়েই দায়িত্ব পালন সম্ভব, সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। আবার কোথাও পরিস্থিতি জটিল হলে কমিশনের হাতে বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।”

‘নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের জন্য কাজ করে না’

নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক মহলের বিতর্ক প্রসঙ্গে রহমানেল মাছউদ বলেন, কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই নির্বাচনী বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “কোনো দলকে সুবিধা দেওয়া বা বঞ্চিত করার জন্য কমিশন কাজ করে না। কমিশনের কাজ হলো একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা।”

তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু কমিশনের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে আইনের প্রয়োগ করা।

গণতন্ত্রের পরীক্ষায় স্থানীয় সরকার: 

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশন অপেক্ষমাণ হলেও নিষ্ক্রিয় নয়। একই সঙ্গে তিনি বারবার মাঠের বাস্তবতা, জনগণের প্রত্যাশা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন নির্বাচিত প্রতিনিধির অনুপস্থিতি প্রশাসনিক কার্যকারিতা, স্থানীয় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে নির্বাচন কবে হবে—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব কত দ্রুত জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

নির্বাচন কমিশনের চলমান প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাড়তে থাকা রাজনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, গণতান্ত্রিক প্রত্যাশারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।